“ডক্টর ইউনুসকে নোবেল দেয়া হয়েছিল তাঁর ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের জন্য। ঠিক তখন থেকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিকল্প নেতৃত্ব চাইছিল আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক। ইউনুস সাহেব নোবেল পান ২০০৬ সালে। এদিকে ‘প্রথম আলো’ নামে একটি পত্রিকার জন্ম হয় ১৯৯৮ সালে। পত্রিকাটি শুরু থেকেই বলতে থাকে—প্রতিদিন দুই নেত্রীর নিউজ প্রথম পাতায় শিরোনাম করার যে ধারা, তারা সেটি করতে চায় না। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া—এই দুজন তখন দেশের প্রধান নেতৃত্ব। প্রথম আলো আর এই দুইজনকে নিউজে গুরুত্ব দিতে রাজি ছিল না। আপনাদের যাদের স্মরণশক্তি ভালো, তাদের মনে থাকার কথা—মতিউর রহমান তাঁর কাগজ নিয়ে এই অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন। আমরা এই কাগজের বিশেষ দিনের বিশেষ সংখ্যায় ডক্টর ইউনুসের কলাম প্রকাশ করতে দেখতাম তখন থেকে। তাঁর কলাম তখন মানুষ পড়ত উৎসাহ নিয়ে। ভদ্রলোক পুরো কলাম জুড়ে দেখাতেন—বাংলাদেশ ব্যবসা করে পৃথিবীতে ধনী রাষ্ট্র হতে পারত, কিন্তু হতে পারছে না দুটি দলের হরতাল-অবরোধ নামের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। তাঁর বিলাপ থাকত—রাজনীতি আমাদের ক্ষতি করে দিচ্ছে; রাজনীতিই আমাদের সব ক্ষতির কারণ। আমাদের তরুণদের মেধা আছে, যোগ্যতা আছে; বিশ্বের দরবারে তা দেখানো যাচ্ছে না শুধু রাজনীতির কারণে।সেনাশাসকরা যেভাবে রাজনীতিকে দায়ী করে ক্ষমতায় থাকতেন, ইউনুস সাহেবের এটা ছিল ‘সিভিল বিরাজনীতিকরণ’। রাজনীতিই সব নষ্টের মূল—এই ধারণাটুকু তরুণদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার রাজনীতিটা তখনো কেউ আলোচনাতেই আনেনি। রাজনীতিবিদরাই যে দেশ চালাবেন, নাকি রাজনীতিবিদরা নষ্ট বলেই রাজনীতিকে আমরা বাতিল করে দিব—এগুলো যে সৃষ্টিছাড়া কথা, তা হরতাল-অবরোধ ও পাল্টাপাল্টির রাজনীতিতে বিরক্ত জনগণের বোঝার মতো সুস্থিরতা ছিল না। ফলে, প্রথম আলোর প্রচলিত রাজনীতির বিপরীতে তাদের সম্পাদকীয় নীতি এবং ইউনুসসহ ‘সুজন’-এর মতো সুশীলদের সংগঠনের কুশীলবদের কলামিস্ট বানানোর প্রকল্প ছিল ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিকে শেষ করার রাজনীতির সূচনা।এই প্রকল্প পুরোপুরি সফলতা পায়। প্রথম আলো বাংলাদেশে কেবল বহুল প্রচলিত কাগজই হয়ে ওঠেনি, তারা গড়ে তোলে একটি ‘নিরপেক্ষ’ ইমেজ। অপরদিকে, ডক্টর ইউনুস শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের জন্য গর্বের প্রতীক। কারণ ইউনুস সাহেবকে সবাই চেনে; এমন সব আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়, কোনো বাংলাদেশীকে যাদের সঙ্গে আমরা কল্পনাও করতে পারি না। পশ্চিমের ধনী ভদ্রমহিলারা বাংলাদেশের কোনো গ্রামের মহিলা ইউনুস সাহেবের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে মুরগি কিনে এখন এক হাজারটা মুরগি আর পাঁচ হাজার ডিমের মালিক হয়ে গেছে—এসব দেখতে ভালোবাসেন। ইউনুস সাহেব ইংরেজিতে সেই সাদা ভদ্রমহিলাদের বুঝিয়ে বলেন, ‘সখিনা আগে একবেলা খেতে পেত না, এখন আমার ঋণ নিয়ে তিনবেলা ভাত খায়।’ ফলে কখনো ডায়না, কখনো স্পেনের রানী সোফিয়া বাংলাদেশে আসেন। একটু একটু করে ইউনুস সাহেব দেশের দোষহীন ফেরেশতা হয়ে ওঠেন একটা ভোদাই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে। বলা ভালো—হয়ে ওঠানো হয়।বিস্তারিত আর না বলি। এরপর কোটা আন্দোলন শুরু হয়। ভিপি নূরুল হকের কোটা আন্দোলন, ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন… অনেক মুখ বারবার টেলিভিশনে দেখানো হয়। নানা পরিচয়ে—কখনো শিক্ষার্থী, কখনো ঈদে বাড়িফেরা ট্রেনযাত্রী, কখনো ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের কর্মী, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সমস্যার প্রতিবাদকারী—ঘুরেফিরে কয়েকটি মুখ। এরাই পরে ২০২৪ সালে কোটা আন্দোলন করবে এবং সমন্বয়ক হবে। এই পরিকল্পনা কম করে হলেও পাঁচ বছর আগের। ডক্টর ইউনুস প্রধান উপদেষ্টা হবেন, এটা এই রকম পাঁচ বছর আগেই ঠিক করা ছিল। কীভাবে বলছি এসব? এই প্রশ্ন তো মাথায় আসছে, তাই না? যদি আর কোনো ইতিহাস নয়, কেবল পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানকে ক্ষমতায় বসানো থেকে ৬ দফার সময় পর্যন্ত পাকিস্তানে মার্কিন গেম দেখেন, তাহলে আমার কথা বিশ্বাস হবে।প্ল্যানটা ছিল খুবই ম্যাচিউরড। কোটা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদেরই সবার আগে সামনে আনতে হবে। শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী ও সমর্থক ব্যবসায়ীদের ব্যাংক লুটপাট ও সীমাহীন দুর্নীতিতে খোদ লীগ সমর্থকরাই বিরক্ত ছিল। ছাত্রলীগের লুঙ্গির নিচে ঢুকে শিবিরের ক্যাডাররা গুন্ডামি করে সরকারের জনপ্রিয়তা আরো ধসিয়ে দিয়েছিল। একই সঙ্গে মৌলবাদীদের কাছে লীগের নতজানু নীতিতে লীগ সমর্থক সংস্কৃতিবানরা ছিল সরকারের ওপর বিরাগভাজন। আর তখন নিরীহ দর্শন কিছু ছাত্র জাতীয় পতাকা নিয়ে, ‘আমার সোনার বাংলা’ গেয়ে, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ বলে, মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়ে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার কসম কেটে নিজেদের মেধাবী দাবী করে বলতে থাকল—তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটার কারণে। ফাঁদে পা দিল জনগণ। বাঙালকে সফলভাবে হাইকোর্ট দেখানো হলো। অনেকেই মনে করল—পরিবর্তন দরকার আছে; আর এই তরুণরা তো প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে। ফলে এক দফা দেওয়ার পরও অনেকে সমর্থন জারি রাখল।এদিকে ফ্রান্সে অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ইউনুস সাহেব তাঁর প্রতিশোধের দিন গুনছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁকেই ফোন করা হবে। তবে যারা ফোন করবে, তারা জানত না যে তাদেরকে কেউ এই পরামর্শটা দেবে। ফলে ইউনুস সাহেব শুরুতে—’না না, আমি পারব না’—বলবেন, তারপর শর্ত দিয়ে মেনে নেবেন; এরকমই স্ক্রিপ্ট লেখা ছিল। সেটাই হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সফলভাবে জামায়াত-শিবির, হিযবুত তাহরীর, পাকিস্তানপন্থী লস্কর-ই-তৈয়বা, চীনপন্থী বাম, ছাত্র ইউনিয়নের মতো বাম—সকলের চেষ্টাতে জামায়াত-শিবিরের অভ্যুত্থান সফল হলো। সঙ্গে ছিল ইসলামিক সেনাবাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতা।৬ আগস্টের পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের উদার সেক্যুলার লিবারেল, সংস্কৃতিজন, মধ্যপন্থী মুসলমান ও সাধারণ নিরীহ জনগণ বুঝতে পারল—দেশ ডাকাতদের হাতে গিয়ে পড়েছে! সচেতন সংস্কৃতিবানরা বুঝতে পারল, পাকিস্তানের পরাজিত শক্তি ১৯৭১ সালের প্রতিশোধ নিতে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। তারা দেখল, বিকল্প তৈরি করা হয়েছে খুবই পরিকল্পিতভাবে:মুক্তিযোদ্ধা $\rightarrow$ জুলাইযোদ্ধাস্বাধীনতা $\rightarrow$ আজাদীমুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবার $\rightarrow$ জুলাই শহীদ পরিবারমুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর $\rightarrow$ জুলাই জাদুঘরস্বাধীনতা $\rightarrow$ স্বাধীনতা ২.০রাজাকার-আলবদর $\rightarrow$ ফ্যাসিস্টমুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিফলকের প্রতিটি প্রস্তরখণ্ড চূর্ণ করে, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করে, জেলে ভরে, যেকোনো মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক উইংকে ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ নাম দিয়ে জুলুম, অত্যাচার, জেল ও জরিমানা করে জুলাইপন্থীরা জুলাইকে প্রতিষ্ঠা করেছে। যারা জুলাইপন্থী, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী। তারা সাম্প্রদায়িক, প্রো-পাকিস্তানপন্থী। নিশ্চিতভাবেই জুলাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অধ্যায়। এই অধ্যায় শোচনীয়ভাবে, নির্মমভাবে পরাজিত হবে। এই অধ্যায় শেষ হবে। লিখে রাখেন! লিখে রাখেন! লিখে রাখেন!
