নিজস্ব প্রতিনিধি : গুলশানের অভিজাত কূটনৈতিক পাড়ার লেকপাড়ে যে জায়গাটিতে একসময় সবুজে ছাওয়া হোলি আর্টিজান বেকারি ছিল, সেখানে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বহুতল আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে দেখে চেনার উপায় নেই যে, আজ থেকে ঠিক এক দশক আগে এই নিস্তব্ধ জনপদেই রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপট। আজ ১ জুলাই, ২০১৬ সালের সেই নৃশংস জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো। সময়ের নিয়মে এক দশক পার হয়ে গেলেও সেই রাতের রক্তক্ষয়ী আতঙ্ক, স্বজন হারানোদের দীর্ঘশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা-ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছিল, তার গভীর ক্ষত আজও দেশের ইতিহাসে অমলিন রয়ে গেছে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই, শুক্রবারের সেই ইফতার-পরবর্তী সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রসহ পাঁচ তরুণ রেস্তোরাঁটিতে ঢুকে নারকীয় জিম্মি সংকট তৈরি করে। প্রথম দফায় উদ্ধার অভিযানে গিয়ে হামলাকারীদের বোমায় নিহত হন পুলিশের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রবিউল করিম ও সালাহউদ্দিন খান। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও ততক্ষণে প্রাণ হারান ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিক। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি উন্নয়ন কর্মী, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী ছিলেন, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
এই হামলার নেপথ্য খতিয়ান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উঠে আসে এক ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি। ইংরেজি মাধ্যম, স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের অত্যন্ত সচ্ছল-শিক্ষিত পরিবারের তরুণদের ‘হিজরত’-এর নামে বাড়ি ছেড়ে আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী মতাদর্শে জড়িয়ে পড়ার চিত্রটি সমাজবিজ্ঞানীদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। তদন্তে জানা যায়, নব্য জেএমবি বা আইএস মতাদর্শী এই চক্রটির মূল লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক পাড়ায় হামলা চালিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়ে নিজেদের সক্ষমতা জানান দেওয়া। পরবর্তীতে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালত তা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে বাংলাদেশে ওই মাত্রার আর কোনো বড় সন্ত্রাসী হামলা না ঘটলেও আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাহ্যিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দাবি করলেও, অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশন এবং তরুণদের মানসিক বিচ্ছিন্নতা দূর করার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাজগুলো এখনও বাকি রয়ে গেছে। ফলে, ১০ বছর পর গুলশানের সেই বিভীষিকাময় রাত কেবল একটি বার্ষিক শোকের স্মৃতি নয়, বরং রাষ্ট্র, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এক চিরস্থায়ী সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে গেছে।
