নিজস্ব প্রতিনিধি : বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে আইনের শাসন পুনরুদ্ধার ও মানবাধিকার সুরক্ষার বড় বড় প্রতিশ্রুতির মাঝেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক আশঙ্কাজনক ও অস্থিতিশীল চিত্র সামনে এসেছে। সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে কেবল মব সহিংসতা বা গণপিটুনির শিকার হয়ে সারা দেশে ৩৩ জন নিহত এবং ১২৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের মাসিক প্রতিবেদনে এই ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মে মাসের তুলনায় জুনে মব জাস্টিসে নিহতের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি আহতের সংখ্যা প্রায় ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের নাগরিকদের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির দাবি, চোর সন্দেহ, ছিনতাইয়ের মনগড়া অভিযোগ, গুজব কিংবা সাধারণ ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির উগ্র জনতা সংঘবদ্ধভাবে এই হামলাগুলো চালাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই শিক্ষক, পুলিশ সদস্য, ব্যবসায়ী, সাধারণ পথচারী এমনকি বিদেশি নাগরিকরাও এই মব সহিংসতার নিষ্ঠুর শিকারে পরিণত হচ্ছেন। অনেক স্থানে মব কালচারকে পুঁজি করে ঘরবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটছে। এমএসএফ সাফ জানিয়েছে, এই প্রবণতা দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাহীনতা এবং সামগ্রিক মানবাধিকার সুরক্ষা কাঠামোর চরম দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে কেবল মব সহিংসতাই নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতার এক অন্ধকার খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। জুন মাসে রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলীয় সংঘর্ষে ৭ জন নিহত এবং ৩০৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া এই এক মাসে বিভিন্ন নদী, সড়ক ও ফসলি জমি থেকে ৬৫টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে মাদক কারবারিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৩ জন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের হেফাজতে মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল সূচকগুলোতেও জুনের চিত্র মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। এমএসএফ-এর তথ্যমতে, গত মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ১ জন, কথিত গোলাগুলিতে ৩ জন এবং কারা হেফাজতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন ৬ জন এবং গ্রেফতার হয়েছেন ৩ জন। সব মিলিয়ে ৩৪৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও জানমালের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
