জুলাই এ রাজপথ কাঁপানো জনতা যখন একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই ক্ষমতার পটপরিবর্তনের দুই বছরের মাথায় এসে সেই আকাঙ্ক্ষার মূল কারিগরদের একাংশের বিরুদ্ধে মব সংস্কৃতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি লন্ডন সফর থেকে ফিরে এক তরুণ সংসদ সদস্যের সংসদে দেওয়া বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ে তাঁর সমসাময়িক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে তাত্ক্ষণিক বিচার বা শাস্তির এই সংস্কৃতি যদি সরকারের পরোক্ষ প্রশ্রয়ে চলতে থাকে, তবে তা দেশের সামগ্রিক আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এবং ক্ষুব্ধ নাগরিকদের দাবি, আন্দোলনের সময়ে ন্যায়বিচারের কথা বলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামানো হলেও, ক্ষমতার কেন্দ্রে বসার পর সেই সুর বদলে গেছে। সমালোচকদের মতে, সংশ্লিষ্ট সমন্বয়ক ও নেতারা এখন ভিন্নমত দমনে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা সামাজিক ট্যাগিংকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। যেকোনো সমালোচক বা প্রতিপক্ষকে তাত্ক্ষণিকভাবে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘বিদেশি দালাল’ আখ্যা দিয়ে জনরোষ তৈরি করা হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মাঠপর্যায়ে সহিংসতা ও হেনস্তাকে উসকে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। বিভিন্ন সুধীসমাজ ও সাংবাদিক সংগঠনের অভিযোগ, এই তরুণ নেতৃত্বের বিলাসবহুল জীবনযাপন কিংবা আর্থিক অনিয়ম নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ হলে আইনি পথে না গিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচার চালানো হয়। এতে সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মী বা প্রতিষ্ঠান চরম সামাজিক হেনস্তার শিকার হয়ে একপর্যায়ে সংবাদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের এক নতুন মব পদ্ধতি।
আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রায় ২৫ কোটি টাকার একটি বড় বরাদ্দ নিয়মবহির্ভূতভাবে হস্তগত করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক কর্মকর্তার অসাবধানতাবশত মন্তব্যের পর, যা পরবর্তীতে ক্ষমতার জোরে ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে রাতারাতি বিলাসী জীবন, গাড়ি ও কোটি কোটি টাকার ভাগাভাগির এই বুর্জোয়া মানসিকতা সাধারণ আন্দোলনকারীদের চরম হতাশ করেছে।
একই সঙ্গে, একদিকে প্রকাশ্য জনসভায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘ফ্যাসিস্ট’ গালমন্দ করা, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে প্রভাবশালী বিতর্কিত নেতাদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করার মতো দ্বিমুখী নীতির অভিযোগও এখন সামনে আসছে। মাঠপর্যায়ের ক্যাডারদের উসকানি দিয়ে সরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করার এই ধারাকে বিশ্লেষকরা দেশের সার্বভৌমত্ব ও শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এই মব সংস্কৃতিকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে বলে মনে করছে সুধীসমাজ।
