নিজস্ব প্রতিনিধি : রাজধানীর তুরাগে আওয়ামী লীগের ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে বর্বরোচিত হামলার ঘটনার নেপথ্য কাহিনী ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছে। এটি কোনো আকস্মিক মব জাস্টিস বা সাধারণ রাজনৈতিক সংঘর্ষ ছিল না, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার একটি ‘কিলিং মিশন’ ছিল বলে গোয়েন্দা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিছিল থেকে নিখোঁজ হওয়া আওয়ামী লীগের ৭ নেতাকর্মীকেই সম্পূর্ণ গুম ও হত্যার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা এস এম জাহাঙ্গীর। ইতিমধ্যে তুরাগ নদী থেকে ৪ জনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বাকি ৩ জনের সন্ধানে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ডিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত ২২ জুনের ভয়াবহ হামলার ঘটনার পর থেকেই গোয়েন্দা পুলিশ নিখোঁজদের অবস্থান এবং ঘটনার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্তে জানা যায়, হামলা পরবর্তী সময়ে এস এম জাহাঙ্গীরের সরাসরি নির্দেশে এবং উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের ওই নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, এস এম জাহাঙ্গীর তার ক্যাডার বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন যে মিছিলে অংশ নেওয়া টার্গেটেড ব্যক্তিদের কাউকেই যেন জীবিত রাখা না হয়। মূলত, ভবিষ্যতে তুরাগ এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমস্ত কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য।
উদ্ধারকৃত ৪ মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, নিহতদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা নিশ্চিত করার পর নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তুরাগ তীরে আরিফুল (ছাত্রলীগ) ও বিপ্লবের (যুবলীগ) পর আরও দুজনের লাশ উদ্ধার হওয়ায় স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
এই কিলিং মিশন বাস্তবায়নে স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল মাতবর, খোকা ভুঁইয়া, রাশেদ খান সুজন, মামুন পারভেজ তন্ময় এবং জাকির হোসেন অর্নবসহ ৮ জনের একটি বিশেষ স্কোয়াড সরাসরি অংশ নেয় বলে অভিযোগে জানা গেছে। এমনকি ২৩ জুনও এই ক্যাডার বাহিনী ছাত্রলীগ কর্মী রাব্বি হাজারীর ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
প্রশাসন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে এস এম জাহাঙ্গীরের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়ার পাশাপাশি তুরাগ থানা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাকর্মীসহ আরও কয়েকজন হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অর্থদাতার সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে।
তবে এই হত্যাকাণ্ডে বিএনপির এই সংসদ সদস্যের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকায় ক্ষমতাসীন দল তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য এই অমানবিক ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এজন্য তারা গণমাধ্যমকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে এবং নিহত পরিবারের সদস্যরা যাতে হত্যা মামলা না করতে পারে সেজন্য অনবরত হুমকি প্রদান করা হচ্ছে।
নিহতদের পরিবারকে চাপ প্রয়োগ করে জোরপূর্বক এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে অপমৃত্যু হিসেবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করানো হয়েছে বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার এমন চেষ্টায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
