নিজস্ব প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা নুরুল আলমকে গ্রেপ্তারের মাত্র এক দিনের মাথায় পুলিশ ও কারা হেফাজতে রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চেয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদসহ পুলিশ ও কারা বিভাগের ৮ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে একটি আনুষ্ঠানিক এজাহার দাখিল করেছেন ভুক্তভোগীর মা নূর জাহান। এজাহারে পুলিশি নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কারা কর্তৃপক্ষের বর্বরতার এক চাঞ্চল্যকর বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
দাখিলকৃত এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, গত ২২ জুন গভীর রাতে ৭ থেকে ৮ জন সদস্যের একটি সশস্ত্র পুলিশ টিম যুবলীগ নেতা নুরুল আলমকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে তাঁর সাতকানিয়ার বাসায় হানা দেয়। এ সময় ভুক্তভোগী নুরুল আলমের বৃদ্ধা মা নূর জাহান পুলিশের কাছে জানতে চান, তাঁর সন্তানের বিরুদ্ধে কোনো ওয়ারেন্ট বা মামলা আছে কি-না। মায়ের এই সরল প্রশ্নের জবাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওয়ান-টেস্ট (ওসি) পরিচয় দেওয়া নুরুল আলম এবং পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম নামের দুই পুলিশ সদস্য সরাসরি নুরুল আলমের পেট ও বুকে সজোরে লাথি মারতে শুরু করেন।
মামলার এজাহার কপিঃ

মুখে-ঘুষি মারার পাশাপাশি তাঁকে টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করার চেষ্টা করা হয়। একই সময় পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার এবং কনস্টেবল ইমদাদও নুরুল আলমের বুক লক্ষ্য করে উপর্যুপরি লাথি মারতে থাকেন। ছেলের জীবন ভিক্ষা চেয়ে মা কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য জাহাঙ্গীরের পা জড়িয়ে ধরে আকুতি-মিনতি করলেও তাঁদের মন গলেনি। উল্টো সেই সময় জাহাঙ্গীরকে তাঁর মুঠোফোনে কাউকে বলতে শোনা যায় যে, তিনি যুবলীগ নেতা নুরুল আলমকে নিয়ে ২নং গেইটে আসছেন।
নূর জাহান তখন জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তাঁর সন্তানকে গভীর রাতে ২নং গেইটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? জবাবে জাহাঙ্গীর স্পষ্ট জানান, এসপি মাসুদ স্যারের বিশেষ নির্দেশেই নুরুল আলমকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর রক্তাক্ত ও আহত যুবলীগ নেতাকে ২নং গেইটে অবস্থিত এসপি মাসুদের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৩ জুন নুরুল আলমকে আদালতে চালান দেওয়া হয়।
আদালত প্রাঙ্গণে মায়ের সাথে ক্ষণিকের দেখায় নুরুল আলম জানান, পুলিশ হেফাজতে তাঁকে পৈশাচিক মারধর করা হয়েছে, যার কারণে তাঁর বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হচ্ছে এবং কয়েক দফা বমিও হয়েছে। এরপর আদালত থেকে কারাগারে পাঠানোর পর গুরুতর অসুস্থ নুরুল আলম যখন কয়েকবার রক্ত বমি করেন, তখন কারাগারের জেলার রাকিব শেখ এসে জানতে চান কেন তিনি বমি করছেন। নুরুল আলম তখন পুলিশের মারধরের নির্মম বিবরণ জেলারকে জানান।
কিন্তু চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে, উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে স্বয়ং জেলার নিজেই অসুস্থ নুরুল আলমকে পুনরায় অমানুষিক মারধর করেন। এই দ্বিমুখী নির্যাতনের ধকল সইতে না পেরে একপর্যায়ে কারাগারের ভেতরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই যুবলীগ নেতা। আদালতে দায়েরকৃত এই হত্যা মামলায় এসপি মাসুদসহ মোট ৮ জনকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আসামিরা হলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এসপি মাসুদ, ইন্সপেক্টর নুরুল আলম, ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর আলম, এসআই আনোয়ার, সাতকানিয়া থানার ওসি, কনস্টেবল ইমদাদ, জেলার রাকিব শেখ এবং জেল সুপার ইকবাল হোসেন। আদালত এজাহারটি আমলে নিয়ে ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনার পর চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
