যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি, এশিয়ান এবং অভিবাসী কমিউনিটির অংশগ্রহণ দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। একসময় শুধুমাত্র ভোটার কিংবা কমিউনিটি সংগঠক হিসেবে পরিচিত অভিবাসীরা এখন সরাসরি নেতৃত্বের আসনে পৌঁছানোর লড়াইয়ে শামিল হচ্ছেন। ২০২৬ সালের নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি নির্বাচন সেই পরিবর্তনেরই এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই নির্বাচন শুধু কয়েকজন প্রার্থীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, অর্জন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতিফলন। একইসঙ্গে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকানদের জন্য মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বার্তা বহন করছে।
নিউইয়র্কের ২০২৬ সালের স্টেট অ্যাসেম্বলি ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশি সহ অভিবাসী কমিউনিটিতে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও আগ্রহ। এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য নয়, বরং সমগ্র অভিবাসী ও এশিয়ান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।
এবারের নির্বাচনে স্টেট অ্যাসেম্বলি সদস্য পদে পাঁচজন বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রার্থী ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা হলেন ডিস্ট্রিক্ট-৩৬ থেকে মেরী জোবাইদা, ডিস্ট্রিক্ট-৩০ থেকে শামসুল হক, ডিস্ট্রিক্ট-৮৭ থেকে সিপিএ জাকির চৌধুরী, ডিস্ট্রিক্ট-৩২ থেকে মোহাম্মদ জে মোল্লা সানি ও ডিস্ট্রিক্ট-৩৭ থেকে পিয়া রহমান। তাঁদের মধ্যে দুইজন প্রগতিশীল নারী প্রার্থী মেরী জোবাইদা ও পিয়া রহমানের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রার্থীরা নিজ নিজ ডিস্ট্রিক্টে ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, আবাসন, জননিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অভিবাসী অধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। পেশাগত অভিজ্ঞতা, কমিউনিটি সেবা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পৃক্ততার কারণে তাঁরা ইতোমধ্যেই ভোটারদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন।
নির্বাচনের আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে ১৩ জুন এবং আগামী ২৩ জুন অনুষ্ঠিত হবে মূল প্রাইমারি নির্বাচন। কমিউনিটির নেতারা মনে করছেন, এই নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক তরুণ বাংলাদেশি, এশিয়ান ও অভিবাসী বংশোদ্ভূত নাগরিককে রাজনীতিতে অংশ নিতে উৎসাহিত করবে। ফলে নিউইয়র্কের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্বের নতুন বাস্তবতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে অভিবাসী কমিউনিটির নেতৃত্ব আরও সুসংহত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ডিস্ট্রিক্ট ৩০-এর প্রার্থী শামসুল হক এনওয়াপিডি কর্মকর্তা ছিলেন। নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে একজন বাংলাদেশি হিসেবে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বর্তমানে অভিজ্ঞ কমিউনিটি সংগঠক, অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং এবং অভিবাসীদের আইনি সহায়তা নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। প্রচারণায় নতুন গতি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ বার্নি সেন্ডার্স-এর সমর্থনে। তাঁর সমর্থন নিঃসন্দেহে প্রচারণায় রাজনৈতিক ও নৈতিক ওজন যোগ করেছে। নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে প্রগতিশীল ভোটারদের একটি শক্তিশালী অংশ রয়েছে। বার্নি স্যান্ডার্সের নাম সেই ভোটারদের কাছে এখনও আস্থার প্রতীক। ফলে এই সমর্থন শুধু প্রচারণার পোস্টারে ব্যবহারের বিষয় নয়—এটি ভোটারদের মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলতে পারে। শামসুল হক দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটির নানা সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত থেকে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। শিক্ষা, অভিবাসী অধিকার, ক্ষুদ্র ব্যবসা, জননিরাপত্তা এবং তরুণদের উন্নয়নের মতো ইস্যুগুলো তাঁর প্রচারণার কেন্দ্রে রয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভোটের দিনে সেই সমর্থনকে ব্যালটে রূপান্তর করতে পারাই হবে আসল পরীক্ষা।
নিউ ইয়র্ক স্টেট এসেম্বলির ডিস্ট্রিক্ট ৩২ নির্বাচনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মোহাম্মদ মোল্লা। কুইন্সের জ্যামাইকা, সাউথ জ্যামাইকা ও রচডেল ভিলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত এই ডিস্ট্রিক্টে তিনি ইতোমধ্যেই কমিউনিটির বিভিন্ন মহলে আশার প্রতীক হিসেবে উঠে আসছেন। এগিয়ে আছেন অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায়।
দীর্ঘদিন ধরে ডিস্ট্রিক্ট ৩২ থেকে প্রতিনিধিত্ব করে আসা ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ভিভিয়ান কুক এবার আর নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। ফলে আসন্ন নির্বাচনে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
স্থানীয় কমিউনিটির অনেকে মনে করছেন, মোহাম্মদ মোল্লার প্রার্থিতা দক্ষিণ এশীয় ও বিশেষ করে বাংলাদেশি আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নতুন মাত্রা যোগ করবে। শিক্ষা, কমিউনিটি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইতোমধ্যেই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুইন্সের বহুজাতিক ভোটব্যাংকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের চাহিদা বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় মোল্লার প্রচারণা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা চারজন সকলেই একই কমিউনিটির হওয়ায় তাদের ভোট ভাগাভাগি হবে। ফলে মোহাম্মদ মোল্লা মুসলিম কমিউনিটি তথা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রার্থী হিসেবে আশার আলো দেখছেন।
আগামী ২৩ জুন অনুষ্ঠিত হবে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিটি ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে, যারা পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নিউইয়র্কে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাব বেশি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে প্রাইমারি নির্বাচনই মূল প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি মোট ১৫০টি আসন নিয়ে গঠিত, যেখানে প্রতিটি সদস্য দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। এই আইনসভা রাজ্যের বাজেট অনুমোদন, আইন প্রণয়ন এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে সরাসরি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশি প্রার্থীদের এই সম্মিলিত অংশগ্রহণ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এবার সেই ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী বাসস্থান, জননিরাপত্তা এবং অভিবাসী অধিকারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রচারণা কৌশল ব্যবহার করছেন।
এছাড়া, এই নির্বাচন বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে ঐক্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রার্থীদের সমর্থনে কাজ করছে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রচারণা চালাচ্ছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রতিটি ডিস্ট্রিক্টেই অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে বাংলাদেশি প্রার্থীদের। অর্থ সংগ্রহ, প্রচারণা পরিচালনা এবং মূলধারার ভোটারদের কাছে পৌঁছানো সবকিছুই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবুও আশাবাদী কমিউনিটির নেতারা মনে করছেন, এই অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে। যদি এই প্রার্থীদের মধ্যে কেউ জয়লাভ করেন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয় পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন হবে।
