নিজস্ব প্রতিনিধি : রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশজুড়ে খুন, টার্গেট কিলিং ও বন্দুক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত মার্চ মাসে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পরপরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতি সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মাত্র তিন মাসে অর্থাৎ মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়—বর্তমানে দেশে গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি খুনের মামলা দায়ের হয়েছে। এই সংখ্যা ২০২৫ সালের প্রকৃত সংখ্যা (৭৬৭টি) এবং ২০২৪ সালের একই সময়ের (৭৯৪টি) তুলনায় অনেক বেশি।
চলতি বছরের এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপরের অবস্থানেই রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ, যেখানে ১৮৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এছাড়া রাজশাহীতে ১০৬টি এবং খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শীর্ষে রয়েছে রাজধানী ঢাকা, যেখানে ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, টিটন, ফ্রিডম রাসু, মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগরের মতো কুখ্যাত গ্যাং লিডার ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীরা কারাগার থেকে জামিনে বা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসায় সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই অপরাধীরা তাদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার ও পুরোনো শত্রুতার জের মেটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
২০০১ সালের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা হাজারীবাগের ইমন ও মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলালের দীর্ঘদিনের বৈরিতার জেরে গত ২৮শে এপ্রিল নিউ মার্কেটের কাছে ইমনের ভগ্নিপতি টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এর আগে গত বছরের জানুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডে হেলালের ভাই ওয়াহেদুল হাসান দীপুর ওপর হামলা এবং ১০ই নভেম্বর court পাড়ার কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে গুলি করে হত্যার পেছনেও ইমনের হাত রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।
গত রোববার ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় প্রকাশ্য রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।
সবশেষ গত শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে অটোরিকশায় আসা ৫-৭ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। ৫ই আগস্টের পর থেকে রাউজান আবারও ২০০১-২০০VI সালের মত ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে নতুন করে আখ্যায়িত হয়েছে।
৫ই আগস্টের পর থেকে কেবল রাউজানেই অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ৩০টি ঘটনাই রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ঘটেছে।
গত শুক্রবার খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রোববার খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভেতর ঢুকে সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক সহিংসতার বড় অংশেই ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিএনপির নেতা-কর্মীরাই জড়িত ছিলেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
গত ১লা মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে দেশজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হলেও তা অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।
টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, থানা থেকে লুট হওয়া এক হাজারেরও বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। ৫ই আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া অনেক অপরাধী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে।
অপরাধীদের ধারণা হয়েছে যে অপরাধ করলেও সহজে পার পাওয়া যাবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ ভেস্তে গেছে, যার ফলে পুলিশের জবাবদিহিতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই বিষয়ে police সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের জড়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। অতীতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীরা বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থার (ক্রসফায়ার) ভয় পেত, তবে বর্তমানে পুলিশ মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে কাজ করছে।
রাজনৈতিক কোন্দল প্রসঙ্গে তিনি জানান, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুধু পুলিশের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের ছাড় না দিতে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
