নিজস্ব প্রতিনিধি :ঘরের মাঠে দুর্দান্ত এক জয় দিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নান্দনিক জোড়া গোলে ভর করে প্যারাগুয়েকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে তারা। লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ‘ডি’ গ্রুপের এই ম্যাচে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ আধিপত্য দেখিয়ে মাঠ ছাড়ে মরিসিও পোচেত্তিনোর দল।
এই জয়ের মাধ্যমে শুধু পূর্ণ তিন পয়েন্টই অর্জন করেনি যুক্তরাষ্ট্র, বরং বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসেও একটি বিশেষ রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে। ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর এটিই বৈশ্বিক আসরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড।
ম্যাচের মূল নায়ক ছিলেন ২৪ বছর বয়সী তারকা ফোলারিন বালোগুন। জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপের এক ম্যাচে একাধিক গোল করা মাত্র দ্বিতীয় মার্কিন ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম লেখান। এর আগে ১৯৩০ সালের আসরে প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই বার্ট প্যাটেনডিউড এক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।
প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে জমজমাট পরিবেশে ম্যাচ শুরু হওয়ার পর প্রথম গোল পেতে স্বাগতিকদের অপেক্ষা করতে হয় মাত্র সাত মিনিট। আক্রমণের সূচনা করেন অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ। দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে তিনি বল বাড়িয়ে দেন ওয়েস্টন ম্যাককেনির কাছে। ম্যাককেনির কাটব্যাক ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল পাঠিয়ে দেন প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার দামিয়ান বোবাদিয়া।
১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর প্রথমার্ধে আরও কয়েকটি আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ২৮ মিনিটে বালোগুনের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও মাত্র তিন মিনিট পর আর কোনো ভুল করেননি তিনি। পুলিসিচের নিখুঁত পাস থেকে এক শক্তিশালী শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এই মোনাকো তারকা।
এরপর ৪১ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করেন বালোগুন। মালিক টিলম্যানের বাড়ানো বল ধরে ডিফেন্ডার ওমার আলদেরেতেকে পেছনে ফেলে গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে পরাস্ত করে দারুণ এক ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান তিনি।
প্রথমার্ধেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। তবে ম্যাচের ধারার বিপরীতে ৬৫ মিনিটে একটি গোল শোধ দেয় প্যারাগুয়ে। সাবেক ব্রাইটন ফরোয়ার্ড হুলিও এনসিসোর পাস থেকে ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত মিডফিল্ডার মাউরিসিও গোল করে ব্যবধান কমান।
তবে প্যারাগুয়ের সেই প্রত্যাবর্তনের আশা বেশি সময় টেকেনি। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় জিওভানি রেইনা অসাধারণ এক গোল করে যুক্তরাষ্ট্রের জয়কে আরও বেশি স্মরণীয় করে তোলেন। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে নেওয়া তার বাঁকানো শটটি সরাসরি জালে জড়িয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্বোধনী ম্যাচকে ঘিরে লস অ্যাঞ্জেলেসে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগীতশিল্পী ক্যাটি পেরিসহ বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক তারকা পারফর্ম করেন। তা ছাড়া গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম ও হলিউডের মেগাস্টার টম ক্রুজও।
তবে সব ছাপিয়ে মাঠের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বালোগুন। নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এই ফরোয়ার্ড ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডে চলে যান এবং আর্সেনালের একাডেমিতে বেড়ে ওঠেন। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেললেও ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
চলতি মৌসুমেও ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন এই স্ট্রাইকার। ২০২৫-২৬ মৌসুমে মোনাকোর হয়ে ১৩ লিগ ম্যাচে ৯টি গোল করেছেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবার বিশ্বকাপের মঞ্চ মাতালেন এই ফরোয়ার্ড।
ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, বালোগুনের নেতৃত্বে মার্কিন আক্রমণভাগ যদি একই ছন্দে খেলতে পারে, তাহলে এবারের বিশ্বকাপে অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৪ সালের পর আবারও নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজন করায় প্রথম পরীক্ষায় সফলভাবেই উত্তীর্ণ হলো পোচেত্তিনোর দল।
গ্রুপ পর্বে স্বাগতিকদের সামনে এখন অপেক্ষা করছে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। আগামী ১৯ জুন গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে একই দিনে নিজেদের পরবর্তী ম্যাচে তুরস্কের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে মাঠে নামবে প্যারাগুয়ে।
