নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেই সংবিধান সংস্কার এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র জটিলতা ও টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া এই সনদকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী শিবিরের মুখোমুখি অবস্থান দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন আদেশটি মূলত পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অন্তহীন প্রতারণার দলিল, যা অধ্যাদেশ বা আইন কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। দলটির মতে, এই আদেশ সার্বভৌম পার্লামেন্টের অধিকার ক্ষুণ্ন করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। বিএনপি এই সনদের মূল চেতনা ধারণ করলেও তারা এমন সংস্কার চায় যা সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘোষণা করেছে, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় অনুসারে সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না। সংস্কার এড়িয়ে গিয়ে দেশে নতুন করে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইলে তার খেসারত বর্তমান সরকারকেই দিতে হবে বলে তারা সতর্ক করেছে।
আন্তর্জাতিক স্বাধীন থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ (আইসিজি) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, সরকারি দল যদি অর্থবহ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তবে জুলাই সনদের কট্টর সমর্থক জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, যা দেশের রাজনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের দিকে ঠেলে দেবে।
এ দিকে এই সনদের আইনি বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতেও রুল শুনানি চলছে, যার পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৭ জুন। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ববর্তী অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা এই সনদের আইনি ভিত্তি দুর্বল এবং বাহাত্তরের সংবিধান পুরোপুরি বাতিল করার ক্ষমতা কারও নেই। তা ছাড়া বর্তমানে জনগণের মূল নজর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থানের দিকে, সংবিধানে কী লেখা আছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কম।
সনদটিতে অন্তর্ভুক্ত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব নিয়েও খোদ সংস্কার কমিশনের সদস্যদের মধ্যেই তীব্র মতবিরোধ দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রপতির সমান্তরাল আরেকটি ক্ষমতাবলয় তৈরি হয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে প্রদেশহীন বাংলাদেশে উচ্চকক্ষ গঠন কেবল ছোট দলগুলোকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখার মাথাভারী রাজনীতি তৈরি করবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন আইনমন্ত্রী। তবে জামায়াতে ইসলামী এটিকে গণভোটের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটানোর চেষ্টা আখ্যা দিয়ে কমিটিতে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ৫টি পদে কোনো নাম জমা দেয়নি। বিরোধী দলের এই অনীহার মাঝেই আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদের বাজেট অধিবেশনে এই ইস্যুটি বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
