ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে উগ্রবাদী সন্দেহে গ্রেফতার হওয়া ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস)-এর প্রধান শাহ আমানত সাবিরের ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক রঙ দিয়ে এবং ভারতের কলকাতায় গ্যাস হামলার কাল্পনিক ছক সাজিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে. ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমের দাবি— বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ বা এনসিপি-র ছাত্র সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা ‘সাব্বির’কে বোমা তৈরির সময় হাতেনাতে ধরেছে পুলিশ এবং সে কলকাতায় হিন্দুদের ওপর গ্যাস হামলা ও বড় ধরনের বিস্ফোরণের ছক কষার কথা স্বীকার করেছে. তবে বাংলাদেশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তদন্ত ও মূল ধারার গণমাধ্যমের তথ্যের সাথে ভারতীয় এই কাহিনীর কোনো মিল পাওয়া যায়নি.
প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, গত রোববার ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকা থেকে উগ্রবাদী সন্দেহে মোট ছয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ, যাদের মূল হোতা শাহ আমানত সাবির. তবে ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী সাবির কোনো রাজনৈতিক দল বা এনসিপির ছাত্রনেতা নন. তিনি মূলত খুলনাভিত্তিক ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস) নামে একটি মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক. অবশ্য তাঁর সাথে গ্রেফতার হওয়া বাকি ৫ জনের মধ্যে আতাউল্লাহ শাহ নামের একজন গাজীপুর মহানগর এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব ছিলেন, যাকে ঘটনার পরপরই দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে. সিটিটিসি’র তিন দিনের রিমান্ড ও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে স্পষ্ট হয়েছে যে, আতাউল্লাহ শাহ বা বাকি চারজন মূলত ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে সাবিরের কাছে কেবলই মার্শাল আর্ট শিখতে এসেছিলেন এবং এই উগ্রবাদের সাথে এনসিপি নেতা আতাউল্লাহ বা বাকিদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা মেলেনি.
সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে সাবিরের বোমা তৈরি ও ভারতের ‘কলকাতা’ বা ‘হিন্দুদের ওপর গ্যাস হামলা’র পরিকল্পনা নিয়ে. ভারতীয় গণমাধ্যম এটিকে একটি আন্তর্জাতিক বা আন্তঃসীমান্ত বড় জঙ্গি চক্রান্ত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের সিটিটিসি’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ভিন্ন তথ্য. জিজ্ঞাসাবাদে সাবির পুলিশকে জানিয়েছেন, কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী নয়, বরং তাঁরা ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা ভারতীয় উপমহাদেশের চূড়ান্ত যুদ্ধের এক কাল্পনিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পটকা বা চকলেট বোমার উপকরণ দিয়ে বোমা বানানোর প্রাথমিক চেষ্টা করছিলেন.
সম্প্রতি প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের সামির ফেসবুকে ফাঁস করা সাবিরের বোমাবাজির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়. ওই ভিডিওতে সাবিরকে একটি নির্জন রাস্তায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ তাকবীর দিতে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে আইএসের গান বাজাতে দেখা যায়, যেখানে সে হুমকি দিয়ে বলে, “হে কুফররা তোমরা তৈরি থাকো… ইউনূস তুই তৈরি থাক”. তবে সিটিটিসির কারিগরি ও গোয়েন্দা তদন্তে দেখা গেছে, সেটি কোনো শক্তিশালী আইইডি (IED) বা গ্যাস বোমা ছিল না; মূলত চকলেট বোমার উপকরণের সঙ্গে পেট্রোল মিশিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনার ডুমুরিয়ার এক নির্জন সড়কে তারা এটি ফুটিয়েছিল. ভিডিওতে নিজেদের অনেক বড় ক্ষমতাশালী ও পারঙ্গম জাহির করতে পরবর্তীতে ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম ‘বুম’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছিল.
এমনকি সংগঠন বা নিজেদের খরচ চালানোর জন্য এই চক্রটি কোনো আন্তর্জাতিক ফান্ডিং পায়নি, বরং খুলনায় একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ইজিবাইক চালককে ‘বিধর্মী ও হিন্দুত্ববাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার ইজিবাইক ও টাকা ছিনতাই করেছিল. যাতে ধর্মীয় দৃষ্টিতে একে অপরাধ বা ‘জুলুম’ মনে না হয় এবং সংগঠনের তহবিলও ভারী হয়. বাংলাদেশের পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট জানিয়েছে, সাবিরের সাথে এখন পর্যন্ত দেশি বা আন্তর্জাতিক কোনো মূলধারার জঙ্গি সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ বা ভারতের কলকাতায় কোনো নাশকতার সুনির্দিষ্ট ছকের সত্যতা পাওয়া যায়নি. পুরো ঘটনাটি তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় এবং ধর্মীয় বক্তাদের অনেকেই সাবিরের এই বোমাবাজির ভিডিও দেখে তাকে ‘র’ (RAW)-এর এজেন্ট বা ধোঁকাবাজ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার মাঝেই ওপার বাংলার সংবাদমাধ্যমে এটিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ‘কলকাতা অ্যাটাক’ ও ‘গ্যাস হামলার’ রূপ দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা.
