দেশে সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশুদের ধর্ষণ ও পাশবিকতার পর হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরাপত্তা হীনতার এমন চিত্র ভাবিয়ে তুলছে সমাজকে, জন্ম দিচ্ছে নানা প্রশ্নের। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাড়ে চার মাসেই ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে কেবল মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই এই নির্মমতার শিকার হয়েছে ২৪ শিশু।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ের নৃশংস ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিশুরা নিজ ঘর বা পরিচিত পরিবেশেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অপরাধীদের প্রায় সবাই ভুক্তভোগী শিশুদের অতি পরিচিত প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজন। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে এবং আইনের হাত থেকে বাঁচতেই সাধারণত কোমলমতি শিশুদের ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ প্রবণতা নয়, বরং সুদীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় দায়ী। মাদকাসক্তির বিস্তার, ইন্টারনেটে বিকৃত কনটেন্টের সহজলভ্যতার পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার চরম ঘাটতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এছাড়া, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মামলার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে কঠোর আইন থাকলেও মূলত এর সঠিক প্রয়োগ ও যথাযথ তদন্তের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। দুর্বল তদন্ত, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং বিচারকের তুলনায় মামলার সংখ্যা অতিরিক্ত হওয়ায় নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অনেক সময়ই কাঙ্ক্ষিত বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় থাকে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা তাদের সহজ লক্ষ্যবস্তু বানায়। সমাজে মানবিক গুণাবলির চর্চা কমে যাওয়া এবং একের পর এক অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এই ধরনের পাশবিক প্রবৃত্তিকে উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে, মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, ঘর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জনপরিসর—কোথাও এখন শিশুরা নিরাপদ নয়, যা সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষার কঙ্কালসার রূপটিকেই উন্মোচিত করে।
পুলিশ প্রশাসন অবশ্য দাবি করেছে, শিশুদের ওপর এমন জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেপ্তার, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং আদালতে নির্ভুল অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি।
