নিজস্ব প্রতিনিধি : সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান তাত্ত্বিক রূপকার মাহফুজ আলমের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে রীতিমতো তীব্র ‘ভূমিকম্প’ শুরু হয়েছে। নিজের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্টে দেওয়া এই দীর্ঘ পোস্টে মাহফুজ আলম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের চেয়েও তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাহীন নীতিগত ব্যর্থতা, আদর্শিক বিচ্যুতি, স্বৈরাচারী শাসন এবং উগ্র ডানপন্থার পৃষ্ঠপোষকতার চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ভেতরে থাকা একজন শীর্ষ উপদেষ্টার এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি আসলে ড. ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলের আসল ‘মুখোশ’ জনসমক্ষে উন্মোচন করে দিয়েছে। ।
মাহফুজ আলম তাঁর পোস্টে ড. ইউনূস সরকারের নৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে লিখেছেন “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ’২৪-কে ’৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি।” বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. ইউনূস ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই তাঁর শাসনামলে দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙচুর, ঐতিহ্যকে অবমাননা এবং জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার যে অপপ্রয়াস চলেছিল, তা দেশের সাধারণ মানুষ মোটেও গ্রহণ করেনি। মাহফুজের লেখায় এটি স্পষ্ট যে, ইউনূস সরকার মূলত প্রগতির মুখোশে ঢাকা এক স্বাধীনতাবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছিল। পোস্টের অন্য অংশে তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে লিখেছেন “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থিদের উত্থানের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে।” সাবেক এই উপদেষ্টা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ইউনূস সরকারের দেড় বছরে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর নগ্ন হামলা, তথাকথিত ঐকমত্য কমিশনের নামে জনবিচ্ছিন্নতা, ট্রাইব্যুনালসহ গোটা বিচার অঙ্গনে দলীয় লোক বসিয়ে বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সংঘতন্ত্র’ বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছিল।
মাহফুজ আলমের এই ‘পরাজিত ও হতাশ বিপ্লবীর আত্মকথন’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নেটদুনিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে এবং খোদ আন্দোলনের সাবেক সহযোদ্ধারাই এখন সাবেক উপদেষ্টাদের ‘অর্থ কেলেঙ্কারি’ ও দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। শাহবাগ থানার সামনে ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর অপরাধে দুই মাস জেল খেটে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া শামসুন নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি) এই পোস্টের নিচে মন্তব্য করেছেন “লীগ সেদিনই ব্যাক করসে, যেদিন ৩২ (ধানমন্ডি ৩২) ভাঙতে গেসিলা। লীগ সেদিনই ব্যাক করসে যেদিন এনসিপির কারণে গোপালগঞ্জে ৫ খুন হয়। এই দুইটা পয়েন্ট বাদ পড়সে।” অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আবু বাকের মজুমদার সরাসরি আর্থিক দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলে লিখেছেন “উপদেষ্টাদের কারও কারও অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টা মিস গেছে ভাই। ওইটা যদি একটু অ্যাড করতেন।” এছাড়া গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ মাহফুজের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন “যখন দেখলেন ইন্টেরিম উগ্র ডানপন্থিদের পেট্রন (পৃষ্ঠপোষকতা) করছে, তখন তো আটকাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে সততার সাথে পদত্যাগ করতে পারতেন। তা না করে আপনি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইছেন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র মাহফুজ আলমকে একসময় ড. ইউনূস নিজেই পাদপ্রদীপে এনেছিলেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে জুলাই আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দপ্তরবিহীন উপদেষ্টা এবং তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু দ্রুতই ইউনূসের ব্যক্তিগত এজেন্ডা ও করপোরেট স্বার্থের সাথে ছাত্রদের গণ-আকাঙ্ক্ষার সংঘাত তৈরি হওয়ায় মাহফুজকে দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। এই রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে স্পষ্ট যে, ড. ইউনূস ছাত্রদের রক্ত ও আবেগকে কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সিঁড়ি বা ‘টিস্যু পেপার’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং কাজ শেষে তাঁদের ছুড়ে ফেলেছেন। মাহফুজ আলমের এই স্বীকারোক্তি আজ দেশের কোটি মানুষের মনে এই গভীর ও বেদনাকাতর প্রশ্নটিই রেখে গেল ড. মুহাম্মদ ইউনূস কি তাহলে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং শত শত শহীদের পবিত্র রক্তের সাথে এক নির্মম প্রতারণা করেছেন?
