নিজস্ব প্রতিনিধি : মাগুরার শ্রীপুরে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আট বছর বয়সী শিশু আছিয়া খাতুনকে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হলেও আইনি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে রয়েছে চূড়ান্ত বিচার। বিচারিক আদালতে মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হলেও উচ্চ আদালতে আপিলের ঘুরপাকে থমকে গেছে মামলার গতি। ফলে একদিকে একমাত্র সন্তানকে হারানোর তীব্র শোক, অন্যদিকে আসামির ফাঁসি কার্যকর না হওয়ার আক্ষেপে দিন কাটছে আছিয়ার হতভাগ্য বাবা-মায়ের।
শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে আছিয়ার জীর্ণ বারান্দায় বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন মামলার বাদী ও আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন। তিনি ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন
“মেয়েডা মারা গেছে এক বছরের বেশি হইছে। বিচারে আসামির ফাঁসি হইছে সেও এক বছর হলো। এখনো অপেক্ষায় আছি, কবে আমার আছিয়ার খুনিদের ফাঁসি হবে। অথচ জেলে বসে সরকারি খাবার খাচ্ছে আসামি হিটু শেখ। এই অবস্থা একজন মা কী করে সহ্য করতে পারে!”
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৫ মার্চ রাতে নিজের বড় বোন ফাতেমার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোট্ট আছিয়া। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হলে আট দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি। আছিয়ার মৃত্যুর পর তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নারী নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মাগুরার বিচারিক আদালত দ্রুততম সময়ে ফাতেমার শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও তাঁর দুই ছেলে খালাস পেয়ে যায়। তবে এরপর থেকেই মামলাটির আইনি গতি থমকে দাঁড়ায়।
বর্তমানে আছিয়ার পরিবার চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আছিয়ার বাবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। ঘটনার পর একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে দেওয়া একটি গাভির দুধ বিক্রি করে কোনো রকমে চলছে এই দম্পতির সংসার। অন্যদিকে, শ্রীপুরে হিটু শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার পর এলাকাবাসীর গুঁড়িয়ে দেওয়া বসতভিটায় প্লাস্টিক ও পুরনো টিন দিয়ে খুপড়ি ঘর বানিয়ে থাকছে আসামির পরিবার। হিটু শেখের মা রোকেয়া বেগম এখনো তাঁর ছেলেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করলেও আদালতে তা প্রমাণ করতে পারেননি।
মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বাদীপক্ষের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম মুকুল জানান, হিটু শেখের পক্ষে উচ্চ আদালতে করা আপিলটি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। সবশেষ গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এই মামলার শুনানি হয়েছিল। তবে বিচার প্রক্রিয়ার এই মন্থর গতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। মাগুরা জেলা গণকমিটির সদস্যসচিব প্রকৌশলী শষ্পা বসু বলেন, “আছিয়ার মতো নির্মম হত্যাকাণ্ডের রায় কার্যকর হতে এত দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে, যার প্রমাণ সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে রাইসা নামের আরেকটি শিশুর হত্যাকাণ্ড। আমরা অবিলম্বে হিটু শেখের ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি।”
