নিজস্ব প্রতিনিধি :
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে এক নজিরবিহীন ও অবিশ্বাস্য নিয়োগ জালিয়াতি, ভুয়া সনদ এবং চরম স্বজনপ্রীতির মহোৎসব উন্মোচন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।
তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক নিজেই নিয়োগ বোর্ডের সদস্যসচিবের চেয়ারে বসে নিজের স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে চাকরি দিয়েছেন। সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী তথ্য হলো, একই পদের নিয়োগ পরীক্ষায় মায়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন নিজের ছেলেও!
ডিআইএ-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ব্যাকডেট’ বা পেছনের তারিখ ব্যবহার, ভুয়া শিক্ষাগত সনদ দাখিল এবং বিধি বহির্ভূতভাবে এমপিওভুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘ বছর ধরে সরকারি কোষাগার থেকে মোট ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৭ টাকা বেতন-ভাতা হিসেবে তুলে আত্মসাৎ করেছে। ডিআইএ-এর মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম এই ঘটনাকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে ‘অনিয়মের প্রকৃষ্টতম উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তদন্তে দেখা গেছে, কলেজ শাখায় যেখানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭০ জন, সেখানে সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ জনে! অর্থাৎ শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি।
তদন্তে সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের শিক্ষাগত ও নিয়োগ নথিতে ভয়াবহ জালিয়াতি ধরা পড়েছে। ২০০০ সালে বিজ্ঞপ্তির শর্ত লঙ্ঘন করে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক হওয়া ইমদাদুল ২০১৪ সালে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি কলেজের অধ্যক্ষ পদে বসেন।
এমপিওভুক্তির আবেদনের সময় তিনি ঢাকা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তরের (মাস্টার্স) যে সনদ জমা দিয়েছিলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তা ‘ভুয়া ও জাল’ বলে প্রত্যয়ন করেছে। কারণ সনদে থাকা মা-বাবার নামের সাথে অধ্যক্ষের মূল নামের কোনো মিল নেই। এছাড়া আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আরেকটি ভুয়া সনদও তিনি দাখিল করেছিলেন। অবৈধভাবে পদ দখল করে রাখা এই সাবেক অধ্যক্ষকে সরকারি কোষাগারে ৪১ লাখ ২১ হাজার ২৬১ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করার জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
স্বজনপ্রীতির খতিয়ান বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে অফিস সহায়ক পদে অধ্যক্ষের স্ত্রী মোসা. ইসমেতারাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর অষ্টম শ্রেণি পাসের ভুয়া সনদে স্বাক্ষর ছিল খোদ স্বামী অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকের। এই পদের নিয়োগ পরীক্ষায় স্ত্রী ইসমেতারার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেন তাঁরই ছেলে ইমরুল হাসান কায়েস। পরবর্তীতে মাউশি (DSHE) অধিদপ্তরের নির্ধারিত প্রতিনিধি ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ছেলে ইমরুল হাসান কায়েসকে ল্যাব সহকারী (আইসিটি) এবং মেয়ে ইসরাত জাহানকে ল্যাব সহকারী (পদার্থবিজ্ঞান) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এমনকি মেয়ের এসএসসি সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে চাকরির আবেদনপত্রের জন্মতারিখে স্পষ্ট জালিয়াতি পাওয়া গেছে।
অবৈধ নিয়োগের কারণে স্ত্রী ইসমেতারাকে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮১৫ টাকা এবং ছেলে ইমরুল হাসানকে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৯৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই পুরো শিক্ষা সিন্ডিকেটের বেতন-ভাতা স্থায়ীভাবে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
