নিজস্ব প্রতিনিধি : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে এর পর থেকেই দেশে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতনের এক কালো অধ্যায় শুরু হয়। গত এক বছরে অন্তত চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক সংবাদকর্মী এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের ৪৯৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ২৬৬ জন সাংবাদিককে গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত হত্যা বা সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে। আসক-এর মতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরাও এই হয়রানিতে জড়িত ছিলেন।
একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপাকে ২০২৪ সালের আগস্টে বিমানবন্দর থেকে আটক করে ডিবি। পরে তাদের পৃথক দুটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। প্রায় দেড় বছর ধরে তারা কারাগারে বন্দি থাকলেও এখনো জামিন পাননি।
সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সীমান্ত এলাকা থেকে আটক করা হয়। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন তারা কারাবন্দি রয়েছেন এবং একাধিকবার তাদের জামিন আবেদন নাকচ হয়েছে। এছাড়াও শওকত মাহমুদ ও মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনও বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা বা দিনের পর দিন জামিন না দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে বর্তমান সরকার দ্রুত এই বিষয়টির সুরাহা করবে।
সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন জানান, ৫ আগস্ট বিকেলে তিনি বঙ্গভবনের সামনে সরাসরি সংবাদ সম্প্রচার করলেও তাকে একই সময়ে মিরপুরে এক যুবক নিহতের ঘটনায় আসামি করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন মানুষ একই সময়ে দুই জায়গায় কীভাবে উপস্থিত থাকতে পারেন। অধিকাংশ সাংবাদিক এখনো এমন ‘ভিত্তিহীন’ মামলার বোঝা বহন করছেন।
সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর, শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন ও মঞ্জুরুল আলম (পান্না) জামিন পাওয়ায় অনেকের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রামে ২৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মামলায় পিবিআই অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। এতে অন্য সাংবাদিকরাও আশা করছেন যে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তারা ন্যায়বিচার পাবেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে কারো বিরুদ্ধে দায় বা প্রমাণ পাওয়া না গেলে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং প্রমাণ পেলে আইনানুযায়ী অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
