গাইবান্ধার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল যুবকদের উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাচার এবং সেখানে নিয়ে চীনা নাগরিকদের কাছে ‘ক্রীতদাস’ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার এক লোমহর্ষক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই ভয়ংকর মানব পাচার চক্রের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন গাইবান্ধা জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহীদ এবং তার বাবা শহিদুল ইসলাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও দরিদ্র এলাকাগুলোর বেকার যুবকদের টার্গেট করে এই চক্রটি। কম্পিউটার অপারেটর পদে মাসিক ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হলেও সেখানে কোনো চাকরি মেলে না; বরং তাদের আটকে রেখে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাহাদ ইবনে শহীদ গাইবান্ধা শহরের ‘বিন্দু আইটি’ নামক কেন্দ্রে তাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিতেন। সেখানে তাদের শেখানো হতো কীভাবে মেয়ে সেজে বা ছদ্মনামে অনলাইন প্রতারণা করা যায়। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর চক্রের অন্য সদস্য হুসেইন কবির ও তার ভাইদের সহায়তায় এসব যুবকদের চীনা স্ক্যামিং প্রতিষ্ঠানের কাছে ২ থেকে ৫ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হতো।
সেখানে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কথিত ‘ডেথ ক্যাম্পে’, যেখানে জোরপূর্বক ‘সাইবার ক্রীতদাস’ হিসেবে অনলাইন জালিয়াতি, ক্রিপ্টোকারেন্সি স্ক্যামিং এবং ব্ল্যাকমেইলের কাজ করানো হয়। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে বা টার্গেট পূরণ না হলে দেওয়া হয় ইলেকট্রিক শক, অমানুষিক মারধর এবং দীর্ঘ সময় খাবার বন্ধ রাখা হয়।
জঙ্গলে মানবেতর জীবন:
বর্তমানে কম্বোডিয়ার থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী পোইপেট শহরের কাছের জঙ্গলে পালিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন সাগর ও হাসান আলীর মতো বেশ কিছু যুবক। হোয়াটসঅ্যাপে তারা জানান, “রাহাদ ও তার বাবা আমাদের বিক্রি করে দিয়েছে। এখন আমরা জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছি, ঠিকমতো খেতে পারছি না। আমরা শুধু দেশে ফিরতে চাই।”
আইনি ব্যবস্থা ও প্রতিবাদ:
এই চক্রের হাত থেকে পালিয়ে আসা অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের ভুক্তভোগী শাফিন মণ্ডলের বাবা নূর ইসলাম বাদী হয়ে রাহাদ ও তার বাবা শহিদুলসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে।
অভিযুক্ত ও দলের বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপি নেতা রাহাদ ইবনে শহীদ সব অস্বীকার করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তার বাবা শহিদুল ইসলাম বিষয়টিকে ‘ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরোধ’ বলে দাবি করলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তা নাকচ করে দিয়েছে। এনসিপির কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।
