নিজস্ব প্রতিনিধি :
৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। গত ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ যে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ শীর্ষক চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে—এটি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং দেশটিকে চিরস্থায়ী দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করার একটি নীল নকশা। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৃষি, জ্বালানি, সামরিক নিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ কার্যত ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিটি বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। চুক্তিতে বাংলাদেশের নাম ২০৫ বার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাম ৫৯ বার উল্লেখ করা হয়েছে, যার সারমর্ম হলো—বাংলাদেশকে কী করতে হবে, তার কঠোর নির্দেশনা। এর মাধ্যমে কৃষি থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর চাবিকাঠি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, মুসলিম প্রধান এই দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, চরিজো ও সালামির মতো ১০ পদের শূকরের মাংস আমদানির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান আমদানি নীতি অনুযায়ী শূকরের মাংস নিষিদ্ধ হলেও, এই চুক্তির মাধ্যমে হারাম খাদ্য আমদানির অবাধ সুযোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি দেশের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি ও পরিবহন খাতেও এই চুক্তি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। কাতার বা অন্যান্য দেশ থেকে সস্তায় এলএনজি কেনার পথ বন্ধ করে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন গ্যাস কেনার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছে জিম্মি করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বিমানকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে, যা বিশ্ববাজার থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উড়োজাহাজ কেনার অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই চুক্তিটি আরও বেশি বিপজ্জনক। বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে এবং যেকোনো কেনাকাটার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোপনীয়তা চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) ভর্তুকির তথ্য জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার ফলে কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
চুক্তির ডিজিটাল ও কাস্টমস সংক্রান্ত ধারাগুলো আরও ভয়াবহ। আইপি আইনের ‘ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট রাইট’ ব্যবহারের মাধ্যমে মার্কিন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের বন্দর ও কাস্টমসের সব তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। এর ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা নিজ দেশেই বিদেশিদের দ্বারা হয়রানির শিকার হতে পারেন। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদসহ বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জনদাবি উঠেছে, ৬০ দিনের নোটিশে এই ‘দাসত্বের দলিল’ বাতিল করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে।
