নিজস্ব প্রতিনিধি : বিগত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে শুরু হওয়া ‘মবোৎসব’-এর সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের ওপর। ২০২৪ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এই তিন মাসেই সারা দেশে অন্তত তিন হাজার শিক্ষক শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন এবং মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন।
তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ এবং ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা দিয়ে তাঁদের জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ রক্ষায় শিক্ষকরা সপরিবারে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বরিশালের গৌরনদীতে ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীকে সপরিবারে স্টাফ কোয়ার্টারের ভেতরে আটকে রেখে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
জানালা-দরজা ভেঙে ফেলার উপক্রম হলে তাঁর মেয়ে ফেসবুক লাইভে এসে প্রাণভিক্ষা চান, পরবর্তীতে সেনাবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে। প্রণয় কান্তি জানান, তিনি কোনো দিন রাজনীতি করেননি, কেবল কড়া প্রশাসক হওয়ার কারণেই স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তাঁর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মবের শিকার হওয়া শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর মতে, ভুক্তভোগী শিক্ষকের সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর মধ্যে ২ হাজার ১০০ শিক্ষকের বেতন চালু হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে এখনো ৭০০ শিক্ষক স্কুলেই ফিরতে পারেননি। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং প্রায় ২০০ শিক্ষক সাহসের সঙ্গে তাঁদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরেছেন ও বেতন পেতে শুরু করেছেন।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে শুরু করে নরোত্তমপুর উচ্চ বিদ্যালয়, এমনকি মফস্বলের নিভৃত পল্লীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও মবের একই ধরণ দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকের জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, গলায় জুতার মালা দেওয়া হয়েছে কিংবা সাদা কাগজে সই করতে বাধ্য করা হয়েছে।
ভিকারুননিসার তৎকালীন অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী এবং সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমকে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী শিক্ষকদের একটি অংশ মিলে ৫ ঘণ্টা অবরুদ্ধ রেখে পদত্যাগে বাধ্য করার নজিরবিহীন চিত্র সিসিটিভি ফুটেজে সংরক্ষিত রয়েছে।
তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এই পরিস্থিতিকে ‘চর দখলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অনেক শিক্ষক এখনো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং পদের লোভে সহকর্মীদের একটি অংশই মূলত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে এই সহিংসতায় উসকানি দিয়েছে। চাকরির শেষ সময়ে এসে সম্মানটুকু ফিরে পাওয়াই এখন এই লাঞ্ছিত শিক্ষকদের একমাত্র আকুতি।
সুত্রঃ কালের কণ্ঠ
