নিজস্ব প্রতিনিধি
দেশের শিক্ষা ও পাঠাভ্যাস উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একক আধিপত্য, আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং প্রকল্পের প্রকৃত ইম্পেক্ট নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ‘আলোকিত মানুষ গড়ার’ গালভরা বুলির আড়ালে প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর এর কোনো কার্যকর প্রভাব পড়ছে না। এমনকি সাবেক শিক্ষামন্ত্রীদের কেউ কেউ এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে অভিহিত করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের রিডিং হ্যাবিট প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ঢাকা এবং কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক। রাজধানীর বাংলামোটরে সংস্থাটির বিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয় পরিচালনা, উচ্চ বেতনভোগী কনসালটেন্সি এবং এনজিও কাঠামোর পেছনেই বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যায়। ইম্পেক্ট অ্যাসেসমেন্টে দেখা গেছে, এই বিলাসবহুল ব্যয়ের বিপরীতে তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস তৈরিতে তেমন কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি।
বলা হচ্ছে, বছরে যে ৪০-৫০ কোটি টাকা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে দেওয়া হয়, সেই অর্থ যদি জেলা পর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি পাঠাগারগুলোর মাধ্যমে বণ্টন করা হতো, তবে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে বই পৌঁছানো অনেক সহজ এবং সাশ্রয়ী হতো।
অভিযোগ উঠেছে, সাবেক প্রভাবশালী আমলা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বছরের পর বছর সরকারি তহবিলের প্রবাহ অব্যাহত রেখেছে। এমনকি এই প্রকল্পের বাইরেও সংস্থাটি বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পায়, যার যথাযথ ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিয়ে অডিট পর্যায়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি আসলে ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ স্টাইলে চলা একটি মডেল, যা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পাঠাভ্যাস গঠন সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ‘মানসিক চাপ’ বা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, তাকে অনেকেই দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে, পাঠ্যতালিকায় বঙ্গবন্ধুর বই থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক তুলে মূল সমস্যার (আর্থিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা) দিক থেকে নজর সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার উন্নয়ন কোনো ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই ‘মনোপলি ব্যবসা’ ভেঙে প্রকল্পটি বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং জেলা লাইব্রেরিগুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত করাই এখন সময়ের দাবি।
প্রান্তিক পর্যায়ের সমাজকর্মীদের দাবি, শুধুমাত্র ঢাকাভিত্তিক কিছু এলিটদের প্রশান্তি দেওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার এই অপচয় বন্ধ করতে হবে। বড় বড় বক্তব্যের আড়ালে স্বচ্ছতা বিসর্জন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে সারা দেশের লাইব্রেরি নেটওয়ার্ককে সচল করাই হবে প্রকৃত ‘আলোকিত সমাজ’ গড়ার পথ।
