নিজস্ব প্রতিনিধি
দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর অবশেষে আওয়ামী লীগের কারাবন্দী কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জামিনের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ‘ঢালাও মামলা: ন্যায়বিচারের স্বার্থে জামিন নিশ্চিত করুন’ শীর্ষক এক সাহসী সম্পাদকীয়র মাধ্যমে পত্রিকাটি আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর চলমান আইনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত সম্পাদকীয়তে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিন পাওয়ার ঘটনাকে একটি ‘ইতিবাচক দৃষ্টান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম আলো প্রশ্ন তুলেছে, যদি সাবেক স্পিকার জামিন পেতে পারেন, তবে একই নীতি কেন অন্যান্য কারাবন্দী নেতাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে না? আইনের চোখে সবাই সমান—এই মৌলিক অধিকার কেন আওয়ামী লীগ নেতাদের ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হচ্ছে, তা নিয়ে পত্রিকাটি তীব্র সমালোচনা করেছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টিকে ‘নেতিবাচক উদাহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে পত্রিকাটি। একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাবন্দী রাখার এই প্রবণতাকে জামিনের অধিকারকে অকার্যকর করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিন কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি একটি মৌলিক আইনি অধিকার। কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ হিসেবে গণ্য করার যে চিরন্তন নীতি, তা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ নেতাদের ক্ষেত্রে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
পত্রিকাটি দাবি করেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনায় হওয়া অনেক মামলায় অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। ঢালাও মামলার কারণে অনেক নিরপরাধ নেতা-কর্মী কারাগারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, যার ফলে তাদের পরিবার ও সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রথম আলোর মতে, এই ঢালাও মামলার সুযোগে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে, যা বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।
মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সমালোচনা করে পত্রিকাটি অবিলম্বে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে জামিন প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে নারী, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ নেতাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মুক্তি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ২০ মাস পর প্রথম আলোর এই অবস্থান পরিবর্তন আওয়ামী লীগের কারাবন্দী নেতাদের আইনি লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করবে। পত্রিকাটির এই সম্পাদকীয় প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ঢালাও মামলা ও দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে অগ্রহণযোগ্য। প্রথম আলোর এই ‘দেরিতে হলেও সঠিক’ অবস্থান বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষে সম্পাদকীয়তে প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে সমঝোতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে, প্রথম আলোরএই সম্পাদকীয় প্রকাশের পর রাজনীতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা মনে করছেন, প্রথম আলোতে হামলার পর পত্রিকাটি বুঝতে পেরেছেন এদেশে মবতন্ত্র কতটা শক্ত অবস্থানে চলে গেছে। অতীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে হাজার বার লেখালেখির পরও কোনো দিন প্রথম আলোতে হামলার ঘটনা ঘটেনি। প্রথম আলো হয়ত বুঝতে শুরু করেছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং উদার মতার্দশ সব সময় ধারণ করা ও প্রকাশ করা সম্ভব না।
