২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের ক্ষমতার পালাবদলের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ ছাড়েন। এরপর একে একে তাদের বিরুদ্ধে পাইকারি দরে নানা অভিযোগে মামলা ও বিচার শুরু হয়। এর মধ্যে গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চায় বাংলাদেশ সরকার। তাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়। এই ২৮ জনের মধ্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করে। শেখ হাসিনাসহ অন্য ২৭ জনের বিরুদ্ধে এখনও ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেনি। তাদের আবেদন ইন্টারপোলে ঝুলে আছে বলে স্বরাষ্ট্র-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
সাবেক ইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হলেও সেটি ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। তার রেড নোটিশ জারির বিষয়টি বাংলাদেশসহ ইন্টারপোলের সব সদস্যরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে। তবে অন্য ২৭ জনের রেড নোটিশের বিষয়টি এখনও ঝুলে আছে।
শেখ হাসিনাসহ যাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে, তারা হলেন শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। অথচ নসরুল হামিদ বিপু দেশেই ছিলেন এবং সাবেক উপদেষ্টা রেজওয়ানা চৌধুরীর নিরাপত্তায় ছিলেন বলে খবর শোনা যায়। বিষয়টি ইন্টারপোল অবশ্যই জানে তাই এমন গনহারে পাতানো মামলার আসামীদের নামে রেড নোটিশ নিয়ে সময় অপচয় করবে না এটাই স্বাভাবিক।
শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে মালিক পক্ষের গাফিলতি এবং দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করার অভিযোগে টিএনজেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন শামীম, ডার্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান ইত্তেমাদ উদ দৌলা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল উদ দৌলার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া রোর ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুল ইসলাম ও উজ্জ্বল হায়দারের বিরুদ্ধেও রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়েছে।
ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পলাতক এস আলম গ্রুপের কর্ণধার (চেয়ারম্যান) সাইফুল আলম, পরিচালক আবু সামাদ ও পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাসানের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করার জন্য ইন্টারপোলে আবেদন করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে ১০৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাইফুল আলমসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। গত বছরের ১৩ মে সাইফুল আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। তবে এর আগেই তারা দেশ ছাড়েন।
হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় পলাতক জেবুন্নেসা আকতার, হাবিব খান, আরিফ সরকার ও মহসিন মিয়া ও আওলাদ হোসেন নামে ৫ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে এখনও ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়নি। এই ৫ জনের মধ্যে স্ত্রী হত্যার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় পলাতক আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ পর্যন্ত ২৮ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে। বাকিদের আবেদন ইন্টারপোলে প্রক্রিয়াধীন।
জানা যায়, হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অর্থপাচার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ওই ২৮ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়। এ ছাড়া পলাতক ওয়ারেন্টভুক্ত কিছু শিল্পকারখানার মালিকের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে।
তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করতে গত বছরের ১০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হয়। পরে পুলিশ সদর দপ্তর নথিপত্রসহ ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেনি। ছাত্র-জনতার নামে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে যান শেখ হাসিনা। এ ছাড়া তার সরকারের সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ক ম মোজাম্মেল হক, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ অনেকেই দেশ ছাড়েন। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ওবায়দুল কাদের ভারতে অবস্থান করছেন।
তথাকথিত জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের ‘নির্দেশ ও ইন্ধনদাতা’ হিসেবে অভিযুক্ত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর আগেই তৎকালীন সরকার তাকে ফেরত দিতে ভারতকে অনুরোধ করে। ওই রায়ের ৪ দিন পর বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হাসিনাকে ফেরত দিতে দ্বিতীয়বারের মতো অনুরোধ জানিয়ে গত বছরের ২১ নভেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। গত বুধবার দিল্লি সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে তাকে আবার ফেরত চাওয়ার কথা জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারকাজ শুরুর পর শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতকে প্রথমবার চিঠি পাঠিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে বিচারকাজ শেষে রায় হয়ে গেলেও সেই চিঠির জবাব দেয়নি ভারত সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পলাতক আসামি এবং আন্তর্জাতিকভাবে চাহিদাসম্পন্ন অপরাধীর বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ ইস্যু করে। বিশেষ করে খুন, সন্ত্রাসবাদ, মানব পাচার, মাদক পাচার, অর্থপাচার, দুর্নীতি ইত্যাদি গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তি। যাদের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা বর্ণগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় ইন্টারপোল সাধারণত রেড নোটিশ ইস্যু করে না। রেড নোটিশ ইস্যুর আগে ইন্টারপোল দেখে মামলাটি রাজনৈতিক কিনা, যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ আছে কিনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করছে কিনা।
