দিনারের মৃত্যুতে দায়ী কে?
কাশিমপুরের দুই নম্বর কারাগারের সুরমা বিল্ডিং- যেখানে শুধু ডিভিশনপ্রাপ্তদের রাখা হয়- সেখানেই দিনারের সঙ্গে আমার পরিচয়। ও আমাদের ওয়ার্ডে আসত ধূপ দিতে- মশা তাড়ানোর সেই ধোঁয়ার আড়ালেই গড়ে উঠেছিল এক নীরব মানবিক সম্পর্ক।
জেলখানার নিয়ম বলছে- শুধু সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীরাই কাজ করবে। কিন্তু দিনার তখনো বিচারের অপেক্ষায় থাকা একজন হাজতি। তবু সে নিজের ইচ্ছায় কাজটা নিয়েছিল। কেন? কারণ কাশিমপুর কারাগারের ভেতরে রাজবন্দীদের জন্য তৈরি করা আরেকটা অদৃশ্য কারাগারের দেয়াল ভাঙতে। তারা নিজেদের বিল্ডিং ছাড়তে পারে না, কিন্তু দিনার ওই কাজের কারণে পারত- আর সেই সুযোগেই সে ঘুরে বেড়াত, কথা বলত, মানুষের কাছে পৌঁছাত।
আমাদের ডিভিশনে একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা ছিল- পাউরুটি, কলা, চা। অনেক সময় সেগুলো অব্যবহৃতই থেকে যেত। দিনার এলে আমরা- আমি আর আমার দুই রুমমেট- মশিউর ও শাহেনশাহ ওকে দিয়ে দিতাম। মনে আছে, শেষবার তাকে এক মুঠো নয়, বেশ অনেকগুলো ভাজা বাদাম দিয়েছিলাম। ছোট ছোট সেই মুহূর্তগুলোই আজ বড় হয়ে বুকের ভেতর চাপা কষ্ট হয়ে আছে।
দীর্ঘ কারাভোগের পর গতকাল মুক্তি পেয়েছিল নাসির আহমেদ দিনার- ঢাকার লালবাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু কী নির্মম পরিহাস- জেল থেকে বের হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু। তার স্বজনেরা অভিযোগ করেছে বিনা কারণে তাকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়েছিল।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
একজন তরতাজা যুবক, যে বছরের পর বছর বিশ্ব বাটপার ইউনূসের জেলখানায় বন্দিত্ব সহ্য করল- তার পরিণতি যদি এভাবে হয়, তাহলে প্রশ্নটা শুধু একটি মৃত্যুর নয়। এটা এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন। কারা নির্যাতন, বিচারহীনতা, আর ক্ষমতার অপব্যবহার- এই তিনের যোগফলই যেন দিনারের অকাল মৃত্যুর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
আওয়ামী লীগ অথবা ছাত্রলীগ করে শুধু এই কারণে দিনারের মতো আরও কত তরুণ নীরবে, অদৃশ্য যন্ত্রণায় প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে- এই প্রশ্নের উত্তর কি কেউ দেবে?
-সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর
