দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখন আলোচনার কেন্দ্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন। ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর জোটগত সমীকরণে কার ভাগ্যে জুটছে সংসদ সদস্যের পদক, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুযায়ী, এবারের সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পাচ্ছে ৩৬টি আসন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পাচ্ছে ১৩টি আসন এবং স্বতন্ত্র জোটের জন্য বরাদ্দ থাকছে একটি আসন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী ১২ মে ভোটের দিন ধার্য করলেও, দলগত মনোনয়নই এখানে মূল চাবিকাঠি। একক প্রার্থী হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকায় দলীয় টিকেট পেতে চলছে জোর লবিং।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৮ এপ্রিল) এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ২৯৬ জন সংসদ সদস্যের ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কমিশনের নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন জানিয়েছেন, দল বা জোট তাদের বরাদ্দকৃত আসন অনুযায়ী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে এবং সেই মনোনয়ন বৈধ হলে কোনো ভোটের প্রয়োজন হবে না। এই প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে রাজধানীর রাজনৈতিক কার্যালয়গুলোতে এখন সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের ভিড় এবং নীতিনির্ধারকদের দফায় দফায় বৈঠক চলছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি দীর্ঘ তালিকা নিয়ে চলছে গুঞ্জন। দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার মতে, এবার অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নতুন মুখ এবং সমাজের পরিচিত পেশাজীবীদের প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। আলোচনায় শীর্ষে রয়েছেন মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান এবং কেন্দ্রীয় নেত্রী শাম্মী আক্তার। সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিলোফার চৌধুরী মনি এবং রেহেনা আক্তার রানুর নাম গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। এছাড়া ত্রয়োদশ সংসদে সরাসরি ভোটে পরাজিত হলেও সানসিলা জেব্রিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা এবং সানজিদা ইসলাম তুলির মতো তরুণ নেত্রীরাও মনোনয়নের দৌড়ে রয়েছেন।
বিএনপির মনোনয়নের ক্ষেত্রে পারিবারিক ত্যাগের বিষয়টিও বিবেচনায় আসছে বলে জানা গেছে। প্রয়াত বর্ষীয়ান নেতা মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ, সাবেক মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে সালিমা বেগম অরুনি এবং খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারের সদস্যদের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, নিপুণ রায় চৌধুরী এবং ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামও শোনা যাচ্ছে। দলের মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক তাজমেরী এস ইসলাম ও অধ্যাপক তাহমিনা বেগমের মতো শিক্ষাবিদদেরও সংসদীয় আসন দিয়ে মূল্যায়ন করার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু নিজ দল নয়, যুগপৎ আন্দোলনে পাশে থাকা সমমনা দলগুলোকেও বিএনপি মূল্যায়ন করতে পারে। এই তালিকায় নারী সংহতির নেতা রেবেকা নীলা, গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার, জেএসডির তানিয়া রব এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার পরিবারের সদস্যদের নাম আলোচিত হচ্ছে। যদিও গণসংহতি আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তাসলিমা আখতারের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত জোটগত সমঝোতা কোন দিকে যায়, সেটিই দেখার বিষয়।
অন্যদিকে, ১৩টি সংরক্ষিত আসন পাওয়া জামায়াত ও তাদের মিত্র জোটে চলছে অত্যন্ত গোপনীয় ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় প্রার্থী বাছাই। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সূত্রে জানা গেছে, দলের মহিলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ নেত্রীরাই এবার অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। বিশেষ করে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারের সদস্য এবং দলের দুঃসময়ে সাহসী ভূমিকা রাখা নারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হতে পারে। জামায়াত জোটের শরিক এনসিপি থেকে মাহমুদা মিতু ও মনিরা শারমিন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একজন প্রতিনিধির সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ১২ মে’র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ হতে যাচ্ছে।
