নিজস্ব প্রতিনিধি
যশোরে বিএনপির ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্লোগান এখন আড়ালে পড়ে গেছে সোনা পাচার আর হুমকির অডিও কেলেঙ্কারিতে। বেনাপোল সীমান্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী ‘গোল্ড সিন্ডিকেট’ এখন সাধারণ মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগের আঙুল সরাসরি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের দিকে। যার রাজনৈতিক আশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যুবদল ও ছাত্রদলের একদল বিতর্কিত নেতা।
যশোরের এই সোনা পাচার চক্রের ভয়াবহতা সামনে আসে হিরা খাতুন নামের এক বিধবা নারীর অভিযোগে। তার স্বামী আলী আহমেদ মারা গেছেন সম্প্রতি। পরিবারের দাবি, জেলা যুবদল ও শার্শা উপজেলা যুবদলের নেতাদের ধারাবাহিক হুমকি আর মানসিক চাপে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। কিন্তু মৃত্যুর পরও থামেনি এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। সোনা ফেরত দেওয়ার দাবিতে হিরা খাতুনকে ফোন করে সন্তান হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপে শোনা যায়, মাগুরা জেলা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোল সরাসরি প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে চাপ দিচ্ছেন। সেখানে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নাম ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে পাচার হওয়া সোনা উদ্ধারের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, প্রতিমন্ত্রী অমিতের সরাসরি নির্দেশে যশোরে গড়ে উঠেছে ‘রানা-তমাল গোল্ড ও মাদক সিন্ডিকেট’। এই চক্রের মূল কুশীলব হিসেবে আলোচিত হচ্ছেন, যশোর জেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনসারুল হক রানা, আহবায়ক এম তমাল আহমেদ, শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শহীদ (গোল্ড শহীদ), মাগুরা জেলা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকুর রহমান কল্লোল।
গেল ৫ আ আগষ্ট দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে বেপরোয়া এই চক্রটি। প্রথমে বেনাপোল বর্ডার দখলে নিয়ে প্রশাসন ও ব্যবসাযীদের জিম্মি করে অবধৈ ব্যবসা পরিচালনা শুরু করে তারা। অভিযোগ করেছে বিভিন্নদলের নেতাকর্মীদের বেনাপোল বর্ডারে প্রশাসনের মাধ্যমে জিম্মি করে রেখে মোটা অংকের টাকা দাবি করে তার। বিশেষ করে আওয়ামীলীগের কোনো নেতাকর্মী পেলে তো কথায় নেই। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মানুষকে ভারতে যেতে বাঁধা দিবে না শর্তে।
দলের ভেতরে থাকা একটি পক্ষ বলছে, প্রতিমন্ত্রী অমিতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এই রানা-তমাল চক্রটি সীমান্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। সাধারণ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যারা এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাদের ওপরই নেমে আসছে প্রতিমন্ত্রীর কোপ।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলে রোষানলের শিকার হওয়ার বড় উদাহরণ যুবদল নেতা ইস্কান্দার আলী জনি। জানা গেছে, রানা-তমাল চক্রের মাদক ও সোনা পাচারের প্রতিবাদ করায় জনিকে মিথ্যা মামলা, হামলা এমনকি কারাবরণ পর্যন্ত করতে হয়েছে। এই ঘটনা দলের ভেতরেও চাপা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ক্লিন ইমেজের নেতাকর্মীরা এখন কোণঠাসা আর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে রাজনীতির মাঠ।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী “প্রমাণ হলে ব্যবস্থা” নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। গোয়েন্দা তথ্য, ভাইরাল অডিও এবং ভুক্তভোগী পরিবারের বয়ান থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেট প্রধানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াকে ‘সময় ক্ষেপণের কৌশল’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকারের মন্ত্রীদের নাম যখন সরাসরি সোনা পাচারের অডিওতে জড়ায়, তখন সরকারের নৈতিক অবস্থান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠে। যশোরের সাধারণ মানুষ এখন প্রশাসনের দিকে না চেয়ে আদালতের দিকে তাকিয়ে আছে। যেখানে একজন বিধবাকে তার ব্যক্তিগত সম্পদ ফিরে পেতেও আইনি লড়াই করতে হচ্ছে।
শহরের বাতাসে এখন একটাই প্রশ্ন—রাজনীতি কি তবে কেবল সোনা পাচার আর লুটপাটের লাইসেন্স? প্রতিমন্ত্রীর নীরবতা আর সিন্ডিকেটের আস্ফালন সেই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করছে।
