ড. মাসুদার রহমান, অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে সংবিধান সংশোধন, বনাম সংস্কার ও পুনর্গঠন নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদে তীব্র বিতর্ক চলছে। জুলাই -পরবর্তী প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে সংবিধান কি শুধু সংশোধন হবে, নাকি আমূল সংস্কার প্রয়োজন। সরকারে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন আদেশকে অবৈধ ও প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করছে এবং বর্তমান কাঠামো বজায় রেখে সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিপরীতে জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল বলছে, মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সংশোধন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ব্যাপক সংস্কার ও একটি পৃথক সংস্কার কমিটি, যেখানে সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে। মূলত দ্বন্দ্বটি দাঁড়িয়েছে সীমিত সংশোধন নাকি গভীর কাঠামোগত সংস্কার।
বাংলাদেশের সংবিধান শুধু একটি আইনি দলিল নয়; এটি জাতির ইতিহাস, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ভিত্তিতেই এই সংবিধানের জন্ম। তাই সংবিধান নিয়ে যেকোনো আলোচনা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং ঐতিহাসিক, চেতনাগত ও মূল্যবোধগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। এতে উল্লেখ করা হয় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর নেতৃত্ব ও ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এই ঘোষণাপত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। একই সঙ্গে এতে জনগণের সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং মুক্তিযুদ্ধকে বৈধতা প্রদান করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা নন; তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও সংবিধান প্রণয়নের প্রধান দিকনির্দেশক। তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিফলিত করে।
উল্লেখযোগ্য যে, সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এসব সংশোধনীর মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা দেশের বাস্তবতার প্রতিফলন হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সংবিধানের পরিবর্তন প্রসঙ্গে “সংশোধন” ও “সংস্কার” এই দুটি ধারণা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক চলছে। সংশোধন বলতে সংবিধানের নির্দিষ্ট ধারায় সীমিত পরিবর্তন বোঝায়, যেখানে মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে। অন্যদিকে সংস্কার বলতে বৃহত্তর ও মৌলিক পরিবর্তন বোঝায়, যা সংবিধানের ভিত্তিগত দিকগুলোও পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক আরও গভীর, কারণ সংবিধানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই অনেকেই মনে করেন, সংবিধানের মূল কাঠামো ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পথ।
এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো—১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ভিত্তিতে যে সংবিধান রচিত হয়েছে, সেটি অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডগত স্বাধীনতার লড়াই ছিল না; এটি ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের ফসল হিসেবে যে সংবিধান রচিত হয়েছে, তা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আদর্শের প্রতিফলন। অতএব, এই সংবিধানকে অক্ষুণ্ণ রাখা মানে শুধু একটি আইনি কাঠামো সংরক্ষণ করা নয়; বরং গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের মতো মূল্যবোধকে ধারণ ও সংরক্ষণ করা। যদি সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, তবে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের নয়, প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরও।
সমসাময়িক বাস্তবতার আলোকে বলা যায় দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে সংশোধন হয়তো প্রয়োজন, কিন্তু ৭২-এর সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন করে সংবিধান রচনা করতে যারা অতিউৎসাহী – তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর এবং ৭২-এর সংবিধান যেন পরাজয়ের গ্লানি বহন করে এমন ধারণাও সমাজে বিদ্যমান। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। কারণ, ১৯৭২ সালের সংবিধান শুধু একটি শাসনব্যবস্থা নির্ধারণকারী দলিল নয়; এটি একটি বিজয়ের দলিল, একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাই একে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও অর্জনকে অস্বীকার করার সামিল বলে মনে হয়।
তবে এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, ফলে সংবিধানের কিছু দিক সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে—যেমন প্রশাসনিক কাঠামো, নির্বাচন পদ্ধতি বা ক্ষমতার ভারসাম্য। কিন্তু এই পরিবর্তন যেন কখনোই সংবিধানের মৌলিক চেতনা ও ঐতিহাসিক ভিত্তিকে ক্ষুণ্ণ না করে। অর্থাৎ, সংবিধানকে একদিকে সময়োপযোগী রাখতে হবে, অন্যদিকে এর ঐতিহ্য ও আদর্শ সংরক্ষণ করতে হবে। এই দুইয়ের সমন্বয়ই একটি রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও টেকসই পথে এগিয়ে নিতে পারে।
সংবিধান শুধু একটি আইনি কাঠামো নয়; এটি জাতির আত্মমর্যাদা, ইতিহাস ও বিজয়ের প্রতীক। তাই এর মৌলিক ভিত্তিকে অস্বীকার করা মানে সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। অতএব, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে—সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রেখে সময়োপযোগী সংশোধন করা। এতে একদিকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে, অন্যদিকে গণতন্ত্রও আরও শক্তিশালী হবে।
