নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বাগদানের পরে ইসলাম বাইরে ঘোরাফেরা অনুমোদন করে কিনা জিজ্ঞেস করেছিলাম। যারা মন্তব্য করেছেন সকলেই বলেছেন ইসলাম এটা অনুমোদন করে না। যুক্তি অনুযায়ী সেটি করার কথা নয়। কারণ, বাগদানের পরে বিয়ে কোন কারণে ভেঙ্গে যেতে পারে। সুতরাং, পরিবারের সম্মতিতে বাগদানের পর বাইরে ঘুরতে যাওয়া শরিয়ত বিরোধী কাজ। ইসলামের নামে ইসলাম বিরোধী কাজ করা মানে হলো ইসলামের নিয়মের প্রতি যথেষ্ট আস্থা এবং শ্রদ্ধার অভাব। আবার যদি দুই পরিবারের সম্মতিতে রেজিষ্ট্রেশন বাদে শুধু বিয়ে পড়ানো হয়, তবে সিমরিনের পরিবার আইনের ভয়ে বিয়েকে বাগদান বলে মিথ্যা বলেছে। এটাও ইসলামের চোখে অপরাধ।
বস্তুত, কে কার সাথে ঘুরলো, হে কাকে বিয়ে করলো, কোন বয়সে করলো এগুলো নিয়ে আমার খুব বেশি মাথা ব্যথা হয় না। তিশা মুশতাক দম্পতির ক্ষেত্রেও আমি এমন ধারনাই পোষণ করতাম। সুতরাং, বিয়ে যদি একান্তই অবশ্যম্ভাবী হয় তবে হতে পারে, যদিও সমাজের চোখে তাকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। আর দেশে প্রচলিত একটি আইন আছে। সেই আইনের প্রতি সকলের শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিৎ।
আমার খারাপ লাগার জায়গাটা অন্যখানে। সিমরিন ফুলের মতো সুন্দর একটি মেয়ে। দেখলে যে কারো মন ভালো হয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর। নারীর সৌন্দর্য নিয়ে আমার নিজস্ব একটি বিশ্লেষণী সিদ্ধান্ত আছে। আমার কাছে মনে হয় সৌন্দর্য নারীর জীবনে মারাত্মক এক বাধা। একটি বাগানের সবচেয়ে সুন্দর যে গোলাপ কলি থেকে প্রস্ফুটিত হওয়ার শুরু থেকে বাগানের পাশে হেঁটে যাওয়া প্রতিটি পথিকের প্রত্যাশার বস্তুতে পরিণত হয়। সবাই সুন্দর গোলাপটাকেই প্রথমে টার্গেট করে। গাছের সবচেয়ে সুন্দর যে ফল তাতে সবাই ঢিল দেয়। অন্যদিকে ডিফর্মড ফুল বা ফল ঠিক সকলের অগোচরে পরিণতির দিকে এগোতে থাকে। সেই জন্যই যে জিনিস যত মূল্যবান তার জন্য ততটা কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়।
সিমরিনের মতো অনেক পরিবারই অতি আধুনিকতা থেকে দ্বীনের পথে নিজেদের পুরোপুরি সমর্পন করে। কিন্তু সিমরিনকে অতি আল্প বয়সে ইঁচড়েপাকা করে তোলা হয়েছে। এই কাজটি করেছে তার পরিবার। সিমরিনের সুন্দর শৈশব নষ্ট করেছে, তার কৈশোরে জিঘাংসাকে ধর্মের মোড়কে আবদ্ধ করে দিয়েছে। এবং শেষ পেরেকটি ঠুকেছে বিয়ের মাধ্যমে।
চোখের সামনে দেখেছি কত মেয়েদের বাল্যবিবাহের বলি হয়ে জীবনের সব সুখ সংসারের ঘানি টানতে টানতে শেষ করেছে। কারো মাবাবা কীভাবে এমন নিষ্ঠুর হতে পারে! বিয়ে মানে হাজারটা রেসপনসেবলিটি, প্রতি মুহুর্তে মানিয়ে নেওয়া। যে সমাজে কর্মজীবী নারীদের প্রতি মুহূর্তে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে হয়, সেই সমাজে বালিকা বধু যে নিজের অধিকার বুঝতে পারবে এমন আশা করা বোকামি। এই সমাজ স্ত্রীকে সম্মান দানের নামে রাধুনি আর সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব দিয়ে রাখে। দামী শাড়ি চুড়ি দিয়ে তার মূল্য চুকায়। আর এভাবেই সিমরিনের অভিভাবকেরা একটি সমাজে ঘুনপোকার মতো কাজ করে।
যার ভোটাধিকার নেই, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই, সে ঠিক বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো
