১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা যখন লাশের স্তূপে পরিণত হচ্ছিল, তখন ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনসুলেটের প্রধান আর্চার কে. ব্লাড নীরব থাকেননি। নিজের সরকারের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে তিনি নিজ চোখে দেখা পাকিস্তানি বাহিনীর ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ বা ‘পরিকল্পিত গণহত্যা’র বিবরণ পাঠিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে। যা ইতিহাসে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে অমর হয়ে আছে।

২৮শে মার্চ, ১৯৭১। ওয়াশিংটনে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে পৌঁছায় এক জরুরি বার্তা। ব্লাড তাঁর সেই বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, “আমরা এখানে ঢাকায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর এক ভয়াবহ সন্ত্রাসের রাজত্বের মূক ও আতঙ্কিত সাক্ষী হয়ে আছি।” তিনি বিশ্বকে জানিয়েছিলেন যে, এটি কোনো সাধারণ দাঙ্গা নয়, বরং আওয়ামী লীগ সমর্থক, ছাত্রনেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নামের তালিকা ধরে ধরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হচ্ছে।
ব্লাড টেলিগ্রামে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেণ্য শিক্ষক অধ্যাপক জি সি দেব, অধ্যাপক ফজলুর রহমান এবং এম. আবেদীন হত্যার নৃশংস খবর। তিনি লিখেছিলেন, ঢাকায় তখন কোনো সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল না; পাকিস্তানি বাহিনী নিছক ‘খুঁজে বের করা ও ধ্বংস করা’র (Search and Destroy) মিশনে নেমেছিল। ব্লাড আরও তুলে ধরেন কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর অ-বাঙালিদের লেলিয়ে দিয়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করা হয়েছিল।
আর্চার ব্লাডের এই প্রতিবেদনটি ছিল তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে এক চরম নৈতিক বিদ্রোহ। যখন নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে চোখ বুঁজে ছিল, তখন ব্লাড সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন কেন ওয়াশিংটন পাকিস্তান সরকারের মিথ্যা দাবি বিশ্বাস করছে? তিনি জানতেন এই সত্য প্রকাশের দায়ে তাঁকে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে, তবুও তিনি লিখেছিলেন, “আমরা নীরব থাকতে পারি না।”
এই সাহসী অবস্থানের কারণে আর্চার ব্লাডকে দ্রুত ঢাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তাঁর উজ্জ্বল কূটনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানা হয়। কিন্তু তাঁর সেই ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের গণহত্যার মুখোশ খুলে দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে যে প্রজন্ম কাজ করছে, তাদের কাছে আর্চার ব্লাড এক চিরস্মরণীয় নাম। তিনি শিখিয়ে গেছেন যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য বলতে বন্দুকের প্রয়োজন হয় না, একটি কলম বা একটি টেলিগ্রামই যথেষ্ট।
