দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব এখন নিয়ন্ত্রণহীন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি মার্চ মাসেই এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ১০ থেকে ২৮ মার্চের মধ্যে আইসিইউ শয্যার অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই ৫১টি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করা গেলে এই শিশুদের একটি বড় অংশকে বাঁচানো সম্ভব ছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। হাসপাতালের মোট রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশই হামে আক্রান্ত শিশু। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আইসোলেশন কর্নারের মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে এবং এক বিছানায় গাদাগাদি করে থাকছে একাধিক শিশু।
গত ২৯ মার্চ এক দিনেই সেখানে ৪৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা না থাকায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৮০ জন শিশুকে রাজশাহীতে স্থানান্তর করা হয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও থামছে না আক্রান্তের ঢল।
চলতি মাসে সেখানে ১০৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে ৫টি শিশু। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ ‘হাম কর্নার’ চালু করতে বাধ্য হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বর্তমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতাকে দায়ী করছেন। শিবগঞ্জের পলিয়ারা খাতুন বা তেলকুপির রুমি খাতুনের মতো শত শত মা এখন তাঁদের সন্তানদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজ রায়হান জানান, নিয়মিত টিকাদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে পড়েছে। বিএনপি সরকারের বর্তমান মেয়াদে স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোগত ভঙ্গুরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার নীতিনির্ধারণী অবহেলাই আজকের এই সংকটের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে যখন অর্ধশতাধিক শিশুর প্রাণ যায়, তখন বুঝতে হবে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
জরুরি ভিত্তিতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম এবং লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এই মৃত্যুমিছিল আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
