“মা মানেই এক নিঃস্বার্থ ত্যাগের নাম” এই প্রবাদটি আবারও রক্তমাংসের বাস্তবতায় ধরা দিল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে। বুধবার বিকেলে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের বাসটি যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার নীল জলরাশিতে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন বাসের ভেতরে যমদূতের সাথে লড়াই করছিলেন ৩৫ বছর বয়সী মা জ্যোৎস্না বেগম। নিজের বাঁচার আকুতি ছাপিয়ে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল ৮ বছরের সন্তান আলিফকে রক্ষা করা। মৃত্যুর ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগে জানালার ফাঁক দিয়ে কলিজার টুকরোকে বাইরের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজে হারিয়ে গেলেন অতল গহ্বরে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা আলিফের বর্ণনা অনুযায়ী, বাসটি যখন পন্টুন থেকে সরাসরি নদীতে পড়ে যাচ্ছিল, তখন ভেতরে কেবল বাঁচার আর্তনাদ। কোলে থাকা আলিফকে নিয়ে জানালার পাশেই ছিলেন জ্যোৎস্না। পানির তোড়ে বাসটি যখন ডুবুডুবু, তখন মা তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে আলিফকে জানালার বাইরে ঠেলে দেন। ৮ বছর বয়সী আলিফ কোনোমতে সাঁতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হলেও মা জ্যোৎস্না আর ফিরে আসেননি। পাড়ে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে পদ্মার ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে আলিফ বিলাপ করছে, “আম্মু আমাকে বের করে দিল, কিন্তু আম্মুকে আর পাচ্ছি না।”
ইতিহাসের পাতায় মায়ের এই অমরত্ব নতুন কিছু নয়। ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মায়ের এই ত্যাগকে সর্বদা সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণীতে মায়ের পায়ের নিচে জান্নাতের যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, জ্যোৎস্না বেগম নিজের জীবন উৎসর্গ করে যেন সেই সত্যকেই আবারও প্রমাণ করলেন। তবে এই মহিমান্বিত ত্যাগের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনা। পন্টুনের পিচ্ছিল অবস্থা আর ফিটনেসবিহীন যানের বলি কেন বারবার সাধারণ মা-বোনদের হতে হবে, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ২৩টি লাশের মিছিলের মাঝে জ্যোৎস্না বেগম হয়তো একটি নাম মাত্র, কিন্তু আলিফের কাছে তিনি আজীবন এক ‘বিজয়িনী মা’ হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।
