এক সাগর রক্তের বিনিময়ে/বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা…’—৫৩ বছর আগে যে বীরদের রক্তে ভিজেছিল এ দেশের মাটি, আজ সেই স্বাধীন দেশের মাটিতেই তাঁদের ওপর নেমে এসেছে নজিরবিহীন অবমাননা ও সহিংসতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে দেশে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত ‘মব-সংস্কৃতি’, যেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার পাশাপাশি জীবন্ত কিংবদন্তি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, এলাকাছাড়া এমনকি নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ‘রিসেট বাটন’ চাপা এবং ইতিহাসের ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ তত্ত্বের আড়ালে সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে। ইউনূস আমলের দেড় বছরে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ হয়েছে মূলত তাঁদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়ের কারণেই। এই সময়ে অন্তত ২৫টি বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত এবং অন্তত ১৪ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
তারাগঞ্জে সস্ত্রীক মুক্তিযোদ্ধা খুন: রহস্যের আড়ালে নৃশংসতা: ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নে নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৭৫) ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়ের (৬০) গলাকাটা মরদেহ। তাঁদের দুই ছেলেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কর্মরত (র্যাব ও পুলিশ)। স্থানীয়দের মতে, যোগেশ চন্দ্র অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা একে ‘সুইচ অন-অফ’ এর মতো বিষয় নয় বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ একজন টাইলস মিস্ত্রিকে গ্রেপ্তার করলেও প্রকৃত মোটিভ নিয়ে জনমনে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
চৌদ্দগ্রামে জুতার মালা: বীরের শ্রেষ্ঠ অবমাননা: ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুর ওপর চলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। স্থানীয় কুশলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তাঁকে লাঠিপেটা করার পর গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হয় এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা স্থানীয় জামায়াত ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগে প্রকাশ। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা কানু এলাকাছাড়া এবং গত ১১ মার্চ তিনি মাইনর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁর ছেলের ভাষ্য, “মুক্তিযুদ্ধ করাই যেন বাবার আজ জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ।”
তারাগঞ্জে সস্ত্রীক মুক্তিযোদ্ধা খুনের মতোই দিনাজপুরে হামলা ও মৃত্যু: ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই দিনাজপুরের খানসামায় মুক্তিযোদ্ধা শরীফ উদ্দিন সরকার ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হন। দলীয় কোন্দল ও ৫ আগস্ট পরবর্তী বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে তাঁর ওপর এই হামলা চালানো হয়। দীর্ঘ দুই সপ্তাহ চিকিৎসার পর ৬ আগস্ট নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বীর যোদ্ধা।
বঙ্গবীর ও সূর্যসন্তানদের বাসভবনে হামলা: মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর টাঙ্গাইলের বাসভবনে ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মুখোশধারী একদল সন্ত্রাসী মই দিয়ে গেট টপকে ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এছাড়া লতিফ সিদ্দিকী, ফজলুর রহমান এবং প্রবীণ আইনজীবী জেড আই খান পান্নার মতো ব্যক্তিত্বরাও বিভিন্ন সময়ে শাসানি ও অপদস্থের শিকার হয়েছেন।
রাজধানী ও জেলাগুলোতে মব-লিঞ্চিং ও লাঞ্ছনা
সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমান: ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর ঢাকায় আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় তাঁকে জনসমক্ষে বেদম প্রহার করা হয়। পরে পুলিশ হামলাকারীদের না ধরে বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাকেই একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়।
বরগুনার আবদুর রশিদ মিয়া: জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে এই অশীতিপর মুক্তিযোদ্ধাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয় এবং তাঁর চশমা খুলে ছুড়ে ফেলা হয়। এক যুবক তাঁকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলে গালিগালাজ করে।
সাবেক সিইসি কে এম নূরুল হুদা: ২০২২ সালের জুনে রাজধানীর উত্তরায় এই মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়ে মব-লিঞ্চিং করা হয়।
জমি দখল ও চাঁদাবাজির দোহাই দিয়ে হামলা
নারায়ণগঞ্জের শামসুল আলম: রূপগঞ্জে চাঁদা না দেওয়ায় ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর তাঁর বাড়িতে লুটপাট ও হামলা চালানো হয়। মুক্তিযোদ্ধা আক্ষেপ করে বলেন, “এখন দেশে সন্ত্রাসীদের দাম বেশি, মুক্তিযোদ্ধাদের নেই।”
নীলফামারীর আব্দুল জব্বার: ২০২৫ সালের ১ জুন জমি দখলের বিরোধে তাঁকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়।
শরীয়তপুরের আবদুর রশিদ সিকদার: ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ জমি মাপজোক করতে গিয়ে প্রতিবেশী সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হয়ে তিনি এখন এলাকাছাড়া।
ভাস্কর্য ও স্মৃতির মিনার চূর্ণ: ইউনূস আমলের এই দেড় বছরে কেবল ব্যক্তি নয়, নিশানায় ছিল ইতিহাসের স্থাপত্যও। ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর ভবন প্রশাসনের সহায়তায় গুঁড়িয়ে দেওয়া, মেহেরপুরের মুজিবনগরের প্রায় ৩০০ ভাস্কর্য একদিনে ভেঙে ফেলা এবং গাজীপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাস্কর্যটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন মব নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী ‘মেটিকুলাস ডিজাইনের’ অংশ ছিল।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক কারণে মুক্তিযোদ্ধারা নির্যাতিত হলেও বর্তমান সময়ে তাঁদের আদর্শিক কারণে আক্রমণ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, তাঁদের যেন এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হচ্ছে যে, একাত্তরে যুদ্ধ করাটা ছিল একটা ভুল সিদ্ধান্ত। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণ মানুষ আবারো সেই চিরচেনা সুরে আশ্বস্ত হতে চাইছে ‘আমরা তোমাদের ভুলব না।’
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ
