জেনারেল মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পরে দেখি সবাই ওয়ান ইলেভেনকে গালি দিচ্ছে! বাঙালির স্মরণশক্তি কচুপাতার পানি। আমাকে বলেন তো, ওয়ান ইলেভেন না হলে বিকল্প কী ছিল?
৩০/৩৫ বছর বয়সীদের তো সেদিনকার ঘটনা স্মরণ থাকার কথা। দেশ একটা স্থবির পরিস্থিতিতে পড়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট পণ করেছিল যে, যেকোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কব্জা করবে। প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন, সে জন্য বিএনপি সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল, যাতে তাঁর পরের প্রধান বিচারপতি অবসরে যেতে দেরি হয় এবং হাসানই শেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হয়ে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হতে পারেন।
কে এম হাসান এর আগে এককালে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন, মানে পুরোপুরি কেন্দ্রীয় নেতা! তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা মানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটাকেই উপহাস করা। সুতরাং আওয়ামী লীগসহ তাদের পক্ষের বিরোধী দলগুলো বড় আন্দোলন গড়ে তোলে।
৪ দলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনে ২৮ অক্টোবর দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকে। স্বাভাবিকভাবেই জামায়াত লম্বা লম্বা কথা বলেছিল। কিন্তু রাজপথে আওয়ামী লীগ ভয়ংকর হিংস্র শক্তি। জামায়াতের লম্বা কথায় ভরসা করে বিএনপি যখন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান—বিএনপি-জামায়াত জোটের সাথে পুলিশ আছে, বিডিআর আছে—তখন আওয়ামী লীগ এতকিছুর মাঝেও গিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। ২৮ অক্টোবর পল্টন এলাকায় সহিংসতায় নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনই জামায়াত-শিবিরের কর্মী। উল্লেখযোগ্য হলেন ছাত্রশিবির নেতা মুজাহিদ। অপরপক্ষে নিহত হন একজন, ছাত্রমৈত্রী নেতা রাসেল।
কে এম হাসান আগের দিনই সরে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু পরের প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে প্রস্তাব না করে বিএনপির প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে নির্বাচন নিয়ে তামাশার সেকেন্ড রাউন্ড শুরু করলেন।
তখনকার যুগে সাধারণত ছ্যাঁচড়ারা উপদেষ্টা হতেন না; অধিকাংশ সময় সমাজের মান্যগণ্য লোকজনই হতেন। এদের মধ্যে ৪ জন পদত্যাগ করে চলে গেলেন। সুতরাং সারাদেশ হয়ে উঠল অসহনীয়। সবকিছুতে অনিশ্চয়তা, প্রতিদিন সংঘাত, প্রতিদিন মৃত্যু।
এই সময়ে মানুষজন প্রকাশ্যে বলাবলি শুরু করল, “আর্মি কোন লবা ছিঁড়ে, আর্মি কেন টেকওভার করে না?”
এরকম অনিবার্য বাস্তবতায় আসে ওয়ান ইলেভেন। আর্মি অপ্রকাশ্যে ক্ষমতা দখল করে। তখনকার আর্মিরও গাটস ছিল। কেউ বলতে পারবে না, ওয়ান ইলেভেনের শুরুর কয়েক মাস ন্যায়বিচার পেতে ব্যত্যয় হয়েছে। যে কেউ আর্মির কাছে গেলে ন্যায়বিচার পেয়েছে। সেটা ওয়াকারের পেটমোটা লুথা আর্মি ছিল না, যে নাহিদকে কাঁধে করে নিয়ে ঘুরবে।
পরেরদিকে যা হয় আর কী। বাঙালি—সে আর্মি হোক বা তাকে ফেরেশতার পদে পদোন্নতি দেওয়া হোক—সে ক্ষমতায় থাকতে চাইবেই, ঘুষ খেতে চাইবেই। আর সুশীল গোষ্ঠী যদি তাদের নাগাল পেয়ে যায়, তাহলে তো বদমাশ টু দ্য ইনফিনিটি হতে সময় লাগে না।
শুরু হলো বাংলাদেশ থেকে রাজনীতিকে নির্বাসনে দিয়ে অরাজনৈতিকতার গেম—মাইনাস টু ফর্মুলা। সেই পাকেচক্রে তারেক রহমানকে ধরে নির্যাতন করে একেবারে চিরতরে কোমর ভেঙে দিল।
কে দিল? হ্যাঁ, এই জেনারেল মাসুদ তাদের অন্যতম।
এই জেনারেল মাসুদ জেনারেল হয়ে উঠেছিল কীভাবে? কারণ সে খালেদা জিয়ার ভাইয়ের ভায়রা।
ইতিহাসের কী করুণ পরিণতি—যারা কুটুম দেখে দেখে অযোগ্যদের প্রমোশন দিয়েছেন, তাদের কবরে মোমবাতি জ্বালাতে সেই আত্মীয়রাই এগিয়ে এসেছে। সে যাক গে।
আজকে জেনারেল মাসুদকে ওয়ান ইলেভেনের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এদের শাস্তি হচ্ছে বাংলাদেশকে রাজনীতি-শূন্য করার ষড়যন্ত্রের কারণে।
আমি দেখলাম, এটি নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সব চেলাবেলা—ডাস্টবিন শফিক থেকে শুরু করে ধ্রোণ ডিরেক্টর ফারুকী পর্যন্ত—সবাই খুব উৎফুল্লতা দেখাচ্ছেন, মানে তারেক রহমানকে একটু চাটছেন আরকি।
আমার কেন যেন হাসি পেল।
কসাইখানায় এক ছাগলকে যখন জবাই করা হয়, আরেক ছাগল পাশে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্তে কাঁঠালপাতা চিবায়।
কিন্তু কোনো ছাগলই মাফ পাবে না। জেনারেল মাসুদের জন্য ১৮ বছর লেগেছে, বাকিদের হয়তো এত দিনও লাগবে না।
