নিজস্ব প্রতিনিধি : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত এক মাদরাসাছাত্রকে ‘জুলাই শহীদ’ সাজিয়ে পরিকল্পিত হত্যা মামলা দায়েরের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক হিংসা চরিতার্থ ও আর্থিক ফায়দা লুটের উদ্দেশ্যে দায়ের করা এই ভুয়া মামলায় আসামি করা হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক ও সমকালের দুই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক নিরপরাধ মানুষকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগস্ট বিকেলে পাটগ্রামের কাউয়ামারী বাজারে বিজয় মিছিল চলাকালীন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান কোরআনের হাফেজ আজিজুল ইসলাম। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রকাশিত শহীদ স্মারক এবং নিহতের বাবার লিখিত আবেদন অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত একটি ডিজিটাল সাইনবোর্ড নামাতে গিয়ে আকস্মিকভাবে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে আজিজুলের মৃত্যু হয়। অথচ এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি পাটগ্রাম থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই বানোয়াট মামলা সম্পর্কে নিহত আজিজুলের পরিবার কিছুই জানত না। বাদীর সঙ্গে তাদের কোনো আত্মীয়তার সম্পর্কও নেই। নিহতের বাবা আব্দুর রহিম ও মা রেজিয়া খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তৎকালীন ওসির চাপের মুখেও তারা মামলা করতে রাজি হননি। নিহতের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছে, কোনো নির্দোষ মানুষকে ফাঁসিয়ে আমি আমার সন্তানকে কবরে কষ্ট দিতে চাই না।” ইতিমধ্যে নিহতের বাবা পুলিশ প্রশাসন ও আদালতে লিখিত আবেদন দিয়ে এই ভুয়া মামলা প্রত্যাহারের এবং বাদীর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এই সাজানো মামলায় ৩৪ নম্বর আসামি করা হয় পাটগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি আজিজুল হক দুলালকে এবং ৪১ নম্বর আসামি করা হয় সমকালের সংবাদদাতা মামুন হোসেন সরকারকে। ঘটনার সময় যথাক্রমে ৮ ও ২১ কিলোমিটার দূরে পেশাগত দায়িত্বে অবস্থান করলেও এই উদ্ভট মামলায় জড়ানোয় দুই সাংবাদিককেই পরিবার পরিজন ছেড়ে দীর্ঘ কয়েক মাস ফেরারি ও আত্মগোপনে কাটাতে হয়েছে। তবে পুলিশি তদন্তে ঘটনাস্থলে তাদের অনুপস্থিতি ও নির্দোষিতার প্রমাণ পাওয়ায় গত বছরের ১০ নভেম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে তাদের অব্যাহতির আবেদন জানিয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
মামলার বাদী মোশাররফ হোসেন, যিনি নিজেকে ‘গ’ শ্রেণির জুলাইযোদ্ধা এবং এনসিপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির জেলা সদস্যসচিব হিসেবে পরিচয় দেন, তিনি সাংবাদিকদের আসামি করার বিষয়ে দায়সারা গোছের সাফাই গেয়েছেন। তবে পাটগ্রাম থানার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আব্দুল জলিল জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের অব্যাহতির আবেদন করা হলেও মামলার অন্যান্য বিষয়ের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশ উত্তোলনের আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
