নিজস্ব প্রতিনিধি : মস্তিষ্কের সংক্রমণ (ব্রেন টিউমার) এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ‘জুলাই শহীদ’ সাজিয়ে গেজেটভুক্ত করা এবং এর ওপর ভিত্তি করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ও কাল্পনিক হত্যা মামলা দায়েরের একের পর এক ভয়ঙ্কর জালিয়াতি উন্মোচন করেছে কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেল। বাদী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ত্রিমুখী কারসাজির সিন্ডিকেটে পিষ্ট হয়ে দেশজুড়ে শত শত নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক এখন ফেরারি ও যাযাবর জীবন কাটাচ্ছেন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ি এলাকার আশিকুর রহমান নামের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির চরম রূপ সামনে এসেছে। প্রথম চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী, আশিকুর ২০২৪ সালের ১২ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত রংপুর মেডিকেল কলেজে মস্তিষ্কের গুরুতর সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) এবং খিঁচুনিজনিত রোগে চিকিৎসাধীন ছিলেন, যেখানে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। পরবর্তীতে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। তবে মৃত্যুর পর ছাত্র নামধারী একটি মহলের তীব্র চাপের মুখে বিএমইউর চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডল ডেথ সার্টিফিকেটে জোরপূর্বক ‘হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রটেস্ট’ (ছাত্র আন্দোলনে মাথায় আঘাত) শব্দগুচ্ছ জুড়ে দেন। দুই দিন লুকোচুরির পর গতকাল সোমবার ডা. মন্তোষ দায় স্বীকার করে কালের কণ্ঠের মুখোমুখি হয়ে বলেন
“আমরা ওর শরীরে কোনো হেড ইনজুরি পাইনি, এমআরআই রিপোর্টেও আঘাতের প্রমাণ ছিল না। তৎকালীন পরিস্থিতি ও স্টুডেন্টদের দাবির মুখেই আমরা ‘অ্যালেজড’ (অভিযোগ রয়েছে) শব্দটি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলাম।”
এই ভুয়া মৃত্যুসনদকে পুঁজি করে আশিকুরকে ‘জুলাই শহীদ’ বানিয়ে গেজেটভুক্ত করা হয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা অনুদানও এনে দেওয়া হয়। এরপর কুড়িগ্রামের প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক ফারুক, নিউজ২৪-এর হুমায়ুন কবির সূর্য এবং এটিএন বাংলার ইউসুফ আলমগীরসহ ১০৪ জনের বিরুদ্ধে একটি গায়েবি হত্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। অথচ জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক রাজ্য জোতী স্পষ্ট জানিয়েছেন, আশিকুর আন্দোলনের ধারেকাছেও ছিলেন না এবং তিনি আগে থেকেই ব্রেন টিউমারের রোগী ছিলেন। এমনকি তৎকালীন সদর থানার ওসির বিরুদ্ধে নিহতের পরিবারকে লাশ তুলতে বাধা দেওয়ার জন্য শিখিয়ে দেওয়ার এবং কাল্পনিক এজাহার মুখস্থ করিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একই ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে ঢাকার উত্তরার একটি হত্যাকাণ্ডে। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরায় মো. আলী হুসেন নামের এক আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় ঢাকার আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। তবে বিস্ময়করভাবে ওই মামলায় ঘটনাস্থল থেকে ২১০ কিলোমিটার দূরে বগুড়ায় অবস্থানরত ৯ জন সাংবাদিকসহ ৫৫ জনকে আসামি করা হয়েছে! এখন টিভির ব্যুরোপ্রধান মাজেদ রহমান ও বাংলা টিভির ফয়সাল হোসাইন সনিসহ অন্যান্য সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নেত্রকোনার বাসিন্দা নিহতের পরিবার এই মামলার বাদী মফিজুল ইসলাম সানাকে চেনেই না এবং মামলার বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অন্ধকার রয়েছে।
এই ঢালাও ও অদ্ভুত মামলাকাণ্ড নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতা সারজিস আলম। গতকাল সোমবার বিকেলে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “১০০ বা ২০০ আসামির মধ্যে অর্ধেকেরই কোনো সম্পৃক্ততা থাকে না। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক আধিপত্য বা মামলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নিরীহ মানুষের নাম দিচ্ছে। লালমনিরহাট বা কুড়িগ্রামের মতো দু-একটি ভুল ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে এবং যদি সত্যিই এ রকম চিকিৎসাগত জালিয়াতি হয়ে থাকে, তবে তা ক্রসচেক করে অবিলম্বে গেজেট থেকে বাতিল করা উচিত।” ।
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ আলম জানিয়েছেন, ভুলবশত তালিকায় ঢুকে পড়া ব্যক্তিদের বাদ দিতে আগে থেকেই সংশোধন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যক্তি ছাড়া কাউকে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, একাত্তর টিভির শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপা, ভোরের কাগজের শ্যামল দত্ত এবং কলামিস্ট শাহরিয়ার কবিরসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বিগত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি রয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করার পরও ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার গণমামলায় জড়িয়ে মফস্বল ও জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের দীর্ঘস্থায়ী ক্যারিয়ার ধ্বংসের এই অপচেষ্টায় চরম উদ্বেগ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনে।
