ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক থেকে দেশের আইন উপদেষ্টা, এই যাত্রাটা অনেকের কাছে একটা সাফল্যের গল্প মনে হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনে এক ডজনের বেশি অভিযোগের স্তূপ দেখে এখন প্রশ্ন উঠছে, আসিফ নজরুল আসলে কোন আইনের চর্চা করতেন? পাঠ্যবইয়ের আইন, নাকি নিজের বানানো আইন?
অভিযোগগুলো পড়লে গা শিউরে ওঠে। জামিন বিক্রি হচ্ছে কোটি টাকায়, বিচারক বদলির ফি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি, সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নেও একই বাজার বসত। একটা শিল্পগোষ্ঠীর সিইও ভাইবোনের সম্পত্তি জালিয়াতি করে আত্মসাৎ করেছেন, পিবিআই তদন্তে প্রমাণ পেয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পর্যন্ত জারি হয়েছে। তারপরও ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে সেই আসামি জামিন পেয়ে গেছেন। গান বাংলার তাপসের জামিনেও কোটি টাকার লেনদেনের কথা জানা গেছে। এই মানুষটাই দেশের আইন মন্ত্রণালয় চালাচ্ছিলেন।
যিনি সারাজীবন টেলিভিশনের পর্দায় আইনের শাসন নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কলাম লিখেছেন, তিনি যদি সত্যিই বিচারকদের পদায়ন করেছেন পয়সার বিনিময়ে, তাহলে এটা দুর্নীতির সাধারণ সংজ্ঞায় আর আটে না। এটা পুরো বিচারব্যবস্থাকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করে দেওয়া। যে আদালতে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় যায়, সেই আদালতের বিচারককেই যদি কেনাবেচা করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই আদালতে বসে দেওয়া রায়গুলোর মূল্য কী?
আর বিদেশে অর্থ পাচারের ব্যাপারটা তো আরও গুরুতর। দেশের টাকা লুট করে বিদেশে পাঠানো মানে এই না যে শুধু একটা পরিবারের সম্পদ বেড়েছে। এর মানে হলো দেশের অর্থনীতি থেকে সেই অর্থ চিরতরে সরে গেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যখন ব্যাংক ঋণের সুদ টানতে হিমশিম খাচ্ছে, বিদ্যুৎ বিলের চাপে নাকাল হচ্ছে, তখন একজন সরকারি উপদেষ্টা যদি শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়ে থাকেন, সেটার জবাব শুধু দুদকে না, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দিতে হবে।
নজরুল ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেকে নির্দোষ বলেছেন। কিন্তু নির্দোষ প্রমাণের জায়গা ফেসবুক না, আদালত। দুদকের তদন্ত যদি অভিযোগগুলো অনুসন্ধানযোগ্য মনে করে, তাহলে সেই অনুসন্ধান দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে হওয়া দরকার। কারণ এই অভিযোগগুলো যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে ১৮ মাসে একজন মানুষ কতটা ক্ষতি করতে পারেন একটা দেশের বিচারব্যবস্থার, সেটার একটা ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে থাকবে এই ঘটনা।
টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না। কিন্তু বাংলাদেশে এই কথাটা বহুবার বলা হয়েছে, আর বহুবার প্রমাণ হয়েছে যে কার্যত অনেকেই আইনের ঊর্ধ্বে থেকে গেছেন। এবার যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে আইন উপদেষ্টার পদে থেকে যিনি আইনকে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁকে সবার আগে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই, কারণ অভিযুক্তের বিদেশে যাওয়ার পথ বন্ধ না হলে আরেকটা পলাতক দুর্নীতিবাজের গল্প তৈরি হতে দেরি হবে না।
