নিজস্ব প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপির দুই নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালের দলীয় পদত্যাগ ঘিরে নতুন করে সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তারা বিএনপির “সকল পর্যায়ের পদ” থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর তাদের সংসদ সদস্যপদ বহাল রয়েছে কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু করেন কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও আইনগত বিভাগের সহযোগী গবেষক হাসান মাহমুদ টিপু। এক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে তা আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিএনপির সকল পর্যায়ের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছেন। সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেন, “আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নন। আপনারা এই সংসদের স্পিকার।”

হাসান মাহমুদ টিপুর মতে, যদি এই পদত্যাগের মাধ্যমে তাদের দলীয় সদস্যপদও বাতিল হয়ে থাকে, তাহলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের সংসদ সদস্যপদও বাতিল হওয়ার কথা। আর সংসদ সদস্যপদ না থাকলে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদেও থাকা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন এবং পরে সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তার সংসদে আসন শূন্য হয়ে যাবে। একইভাবে সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলেও তার সদস্যপদ বাতিল হতে পারে।
অন্যদিকে সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদের ২(খ) ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হতে হবে। ফলে কেউ যদি সংসদ সদস্য না থাকেন, তাহলে তিনি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন না।
এ বিষয়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাংবাদিক আমীন আল রশীদ “স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সংসদ সদস্যপদ থাকা না থাকার তর্ক” শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখায় বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১২ মার্চ বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন যে, জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছেন।
একইভাবে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তার পদত্যাগপত্রে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সম্পাদকসহ দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয় ১২ মার্চ। ওইদিন বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয় এবং পরে তারা শপথ গ্রহণ করেন।
শপথ নেওয়ার পর স্পিকারের চেয়ারে বসে মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ব্যবস্থা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ে জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আশা করি। বিরোধী দল যাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সে জন্য আমি সর্বদা সচেষ্ট থাকব।”
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, “সকল পর্যায়ের পদ থেকে পদত্যাগ” কথাটি যদি দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদকেও অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে। সে কারণে বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই এ ধারা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য হাফেজ হাবীবুর রহমানসহ কয়েকজন সদস্য এ বিধানের বিরোধিতা করেছিলেন।
পরবর্তীতে গণপরিষদ সদস্য নুরুল হকের সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে ধারা ৭০ সংশোধিত আকারে গৃহীত হয়। এতে বলা হয়—কোনো ব্যক্তি যদি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে পরে সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে।
১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর সময় এ ধারায় কিছু পরিবর্তন এলেও ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানের মূল বিধান আবার ফিরিয়ে আনা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করলেও অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এ ধারা সংস্কারের দাবি উঠছে।
২০০২ সালে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য একটি বেসরকারি বিলও সংসদে উত্থাপন করেছিলেন, যদিও তা পাস হয়নি।
এদিকে সম্প্রতি সংবিধান সংস্কার কমিশনও ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কেবল অর্থ বিল ও আস্থা ভোটের ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে হবে; অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে ও ভোট দিতে পারবেন।
সব মিলিয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের দলীয় পদত্যাগের বিষয়টি নতুন করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ককে সামনে এনে দিয়েছে। এখন রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট মহলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কী ব্যাখ্যা আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে পর্যবেক্ষকদের।
