বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মর্যাদার আসন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের প্রতীক এবং সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিনি ফৌজদারি বিচারের আওতার বাইরেও থাকেন। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো কার্য করা বা না করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না।
কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির পদ ক্রমে এমন এক অবস্থানে নেমে এসেছে, যাকে অনেকেই কেবল “অনুমোদনদাতা” বা “হ্যাঁ-মানুষ” ধরনের একটি পদ বলে মনে করেন। এই প্রবণতার সূচনা মূলত ১৯৯৬ সালের পর থেকে।
বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন কিংবা বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেন। কিন্তু সেই ভাষণ তাঁর নিজের লেখা নয়। প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা যে বক্তব্য অনুমোদন করে, রাষ্ট্রপতি কার্যত সেটিই সংসদে পড়ে শোনান।
ফলে সংসদ বা জনগণ—কেউই রাষ্ট্রপতির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশের পরিস্থিতি বা সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানার সুযোগ পান না।
এই পরিস্থিতির সূচনা হয় ১৯৯৬ সালে। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের কার্যবিধিতে সংশোধন এনে একটি বিধান যুক্ত করেন, যাতে বলা হয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ মন্ত্রিসভা অনুমোদন করবে।
এই সিদ্ধান্তটি মূলত তখনকার রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন। তিনি আগের সংসদের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সেই সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ফলে নতুন সরকারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দূরত্ব ছিল।
এর ফলেই এমন এক রাজনৈতিক প্রথার সূচনা হয়, যেখানে রাষ্ট্রপতির পদ ধীরে ধীরে প্রধানমন্ত্রীর অধীনস্থ এক আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
তবে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর প্রথম দিকে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। ১৯৯১ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর যে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হয়, তার প্রথম কয়েক বছরে রাষ্ট্রপতিরা সংসদে নিজেদের ভাষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বাধীনতা পেতেন।
পরে শেখ হাসিনার নেওয়া সেই নীতির প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে তাঁর নিজের দলকেই ভোগ করতে হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বড় পরাজয়ের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।
আবদুর রহমান বিশ্বাসের মেয়াদ শেষ হলে সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯১ সালের অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সাহাবুদ্দীন আহমদ ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তার জন্য পরিচিত ছিলেন। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনের সহিংসতা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সরকারের সব সিদ্ধান্তে নির্বিকার সম্মতি দেননি। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সংসদের উদ্বোধনী ভাষণ নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
কারণ সেই ভাষণে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা ছিল। যদিও বাস্তবে সেই ভাষণও রাষ্ট্রপতির নিজের লেখা ছিল না; বরং সদ্য গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভা তা প্রস্তুত করেছিল।
পরবর্তী সময়েও রাষ্ট্রপতির পদটি ক্রমে আরও আনুষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর পদটির মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মাত্র সাত মাসের মাথায় তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
তারপর রাষ্ট্রপতি হন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তাঁর সময় থেকেই রাষ্ট্রপতির পদকে ব্যঙ্গ করে অনেকেই “ইয়েসউদ্দিন” বলতে শুরু করেন।
এরপর জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ কিংবা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন—কেউই এই প্রতিষ্ঠানের শক্ত অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারেননি বলে সমালোচকরা মনে করেন।
বাস্তবে এখন রাষ্ট্রপতির পদটি অনেকটাই আনুষ্ঠানিক রীতিতে সীমাবদ্ধ। সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে ধন্যবাদ প্রস্তাবের দীর্ঘ আলোচনা হলেও সেই ভাষণ সাধারণত সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ এবং বিরোধীদের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে।
অন্যদিকে সংসদ সদস্যরা সংসদীয় বিশেষাধিকার ভোগ করেন। তারা সংসদে দেওয়া বক্তব্যের জন্য আদালতে দায়ী হন না। ভারতের সংবিধান কিংবা যুক্তরাজ্যের বিল অব রাইটসেও এই ধরনের সুরক্ষা রয়েছে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতির নিজের বক্তব্য দেওয়ার স্বাধীনতা নেই—এটাই বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রপতির পদ কি কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতীক হিসেবেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে?
