চ্যানেল-১৪ প্রতিবেদন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদপ্তরে সাব-রেজিস্ট্রার বদলিকে ঘিরে শতকোটি টাকার অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল–এর দায়িত্বকালীন সময়ে বিদ্যমান বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়েছে।
আট মাসে ২৮২ বদলি
অক্টোবর ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫—এই আট মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে অন্তত ২৮২ জনকে বদলি করা হয় বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ জন জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের অফিসে বদলি নেন—এমন অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের।
অতীতে এত স্বল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক বদলির নজির নেই বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা।
নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগ
২০০৯ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিন গ্রেডে বিভক্ত। বিধি অনুযায়ী নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের ‘সি’ গ্রেডে পদায়ন, পাঁচ বছর সন্তোষজনক চাকরির পর জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ‘বি’ এবং পরে ‘এ’ গ্রেডে উন্নীত হওয়ার নিয়ম রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট মেট্রোপলিটন ও জেলা এলাকায় পুনঃপদায়নের ক্ষেত্রেও সময়সীমা নির্ধারিত।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে এই বিধান মানা হয়নি। ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেডে পদায়ন দেওয়া হয়েছে, আবার ঘুষে অনাগ্রহী ‘এ’ গ্রেডের কয়েকজনকে নিম্নগ্রেডে বদলি করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন থেকে চারবার বদলির ঘটনাও ঘটেছে। যোগদানের আগের দিন বদলি স্থগিত বা পুনর্বহালের আদেশ জারির নজিরও রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি আদেশ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। পরবর্তী মাসগুলোতে ধারাবাহিক আদেশে শতাধিক বদলি কার্যকর হয়। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি পৃথক আদেশে ১৯৫ জনকে বদলি করা হয়। শুধু ২৭ এপ্রিল একদিনেই ৪৫ জনের বদলির আদেশ জারি হয়।
সতর্কবার্তার পর স্থগিত
বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ তীব্র আকার ধারণ করলে গত বছরের ১ জুন আইন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বদলি ও পদায়নে কোনো আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই এবং প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই বিজ্ঞপ্তির পর নতুন করে আর কোনো বড় বদলির আদেশ জারি হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিবন্ধন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা চ্যানেল-১৪-কে বলেন, “আগেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল, তবে নীতিমালার কাঠামো মোটামুটি মানা হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সময়ে তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। নীতিভঙ্গের বিষয়টি তদন্ত করলেই আর্থিক লেনদেনের চিত্র স্পষ্ট হবে।”
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন–এর মুখপাত্র আক্তার হোসেন বলেন, অভিযোগ কমিশনের নজরে এলে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে-ই হোন, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
