ফোরটিন ডেস্ক : পকেটে বিমানের টিকিট কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই, অথচ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সুইডেনে অপেক্ষা করছেন হৃদয়ের মানুষটি। এমন বিরূপ বাস্তবতায় ভালোবাসাকে জয় করতে ১৯৭৭ সালে এক তরুণ ভারতীয় শিল্পী যে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা আজও বিশ্বজুড়ে চর্চিত এক কালজয়ী প্রেমকাহিনি। প্রেমিকার কাছে পৌঁছাতে নিজের সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে একটি সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল কিনে ভারত থেকে একাই সুইডেনের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিলেন প্রদ্যুম্ন কুমার (পি কে) মহানন্দিয়া।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭৫ সালে। সুইডেন থেকে ভারতে ঘুরতে এসে তৎকালীন দিল্লির কনট প্লেসে তরুণ শিল্পী মহানন্দিয়ার কাছে নিজের প্রতিকৃতি (পোর্ট্রেট) আঁকাতে এসেছিলেন শার্লট ফন শেডভিন নামের এক সুইডিশ নারী। ছবি আঁকার সেই সংক্ষিপ্ত পরিচয় থেকেই দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রেমের সম্পর্ক। তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও একপর্যায়ে শার্লটকে নিজ দেশ সুইডেনে ফিরে যেতে হয়।
দূরত্ব তৈরি হলেও চিঠির মাধ্যমে তাঁদের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। কিন্তু একসময় বিরহ সহ্য করতে না পেরে সুইডেন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মহানন্দিয়া। শার্লটের পাঠানো ভ্রমণের আর্থিক সাহায্য ফিরিয়ে দিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের শক্তিতেই পৌঁছাবেন। ১৯৭৭ সালের ২২ জানুয়ারি একটি পুরোনো সাইকেল নিয়ে দিল্লি থেকে সুইডেনের পথে একা রওয়ানা হন মহানন্দিয়া।
পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ক হয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ইউরোপের দিকে এগোতে থাকেন তিনি। দীর্ঘ এই চার মাসের কষ্টকর যাত্রায় তাঁর মূল চালিকাশক্তি ছিল ছবি আঁকার দক্ষতা। পথের মাঝে মানুষের প্রতিকৃতি একে তিনি খাবারের সংস্থান ও রাতে থাকার ব্যবস্থা করতেন। ইউরোপে পৌঁছানোর পর ভিয়েনা থেকে ট্রেনে চড়ে অবশেষে ১৯৭৭ সালের মে মাসে সুইডেনের গোথেনবার্গে শার্লটের কোলে পৌঁছান তিনি।
ভিন্ন সংস্কৃতি ও সামাজিক পটভূমির বাধা পেরিয়ে পরবর্তীতে তারা স্থায়ীভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তাদের দুই সন্তান রয়েছে এবং তারা সুখে-শান্তিতেই সুইডেনে বসবাস করছেন। এই অভূতপূর্ব যাত্রাকে মহানন্দিয়া কখনো অলৌকিক বা বীরত্বের কাজ হিসেবে দেখতে রাজি হননি; তাঁর সহজ কথা—তিনি সাইকেল ভালোবাসতেন না, ভালোবাসতেন মানুষটিকে।
