বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে কবি মোহন রায়হানের পুরস্কার স্থগিতের ঘটনায়। পুরস্কার ঘোষণার পর তা প্রত্যাহার বা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে সাহিত্য অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত শুধু একজন লেখককে অপমানই করেনি, বরং প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ঘোষণা অনুযায়ী কবিতা বিভাগে মোহন রায়হানকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তাকে পুরস্কার গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিতেও অংশ নিতে বলা হয় এবং তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিতও হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে তার নাম আর ঘোষণা করা হয়নি। পরে জানানো হয়, কিছু অভিযোগ ওঠায় পুরস্কারটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে কী অভিযোগ, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম গণমাধ্যমকে বলেন, “মোহন রায়হানের ব্যাপারে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় সাময়িকভাবে পুরস্কারটি স্থগিত করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে খতিয়ে দেখে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” অন্যদিকে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে’ মঞ্চে তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।
এই অবস্থানকে অনেকেই দ্বৈত আচরণ হিসেবে দেখছেন। প্রশ্ন উঠেছে, জুরি বোর্ড ও মহাপরিচালকের অনুমোদনের মাধ্যমে যখন একটি নাম চূড়ান্ত করা হয়, তখন কি সংশ্লিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না? যদি অবগত না হয়ে থাকেন, তবে তা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার দুর্বলতা নির্দেশ করে। আর অবগত থেকেও যদি পরে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানটির নীতিগত অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সমালোচকদের মতে, সাহিত্যে অবদানের জন্য ঘোষিত পুরস্কার রাজনৈতিক বা অপ্রকাশিত বিবেচনায় স্থগিত করা হলে তা নৈতিকতার পরিপন্থী। তাদের বক্তব্য, একজন লেখককে প্রকাশ্যে ডেকে এনে পরে নাম ঘোষণা না করা সাধারণ শিষ্টাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার পরিপন্থী। এতে ব্যক্তিগত মানহানি যেমন ঘটে, তেমনি পুরস্কারের সুনামও ক্ষুণ্ন হয়।
গত বছরও পুরস্কার ঘোষণা ও বাতিলকে ঘিরে বিতর্ক হয়েছিল। ফলে ধারাবাহিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জুরি বোর্ডের সদস্য কারা, কী প্রক্রিয়ায় তারা নির্বাচিত হন এবং কেন তাদের নাম প্রকাশ করা হয় না—এসব বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি উঠেছে।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একাধিক ব্যক্তি মনে করছেন, পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা, অভিযোগ যাচাইয়ের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং ঘোষণার আগে পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর একই ধরনের বিতর্ক পুরস্কারের মর্যাদাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বাংলা একাডেমি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে—এমন মতও উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর সংবাদ সম্মেলন বা প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও জানানো হয়েছে।
মোহন রায়হানের পুরস্কার স্থগিতের ঘটনায় এখন সাহিত্য অঙ্গনে যে প্রশ্নগুলো জোরালো হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—সাহিত্য পুরস্কার কি কেবল সাহিত্যিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে, নাকি অন্য বিবেচনাও প্রভাব ফেলছে? এ প্রশ্নের স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তরই এখন প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
