দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাব ৩ হাজার ৬৪টি ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, গত ডিসেম্বর দুই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও দুটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উপর হামলা মোটেই আকস্মিক ছিল না। ১৩-১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন উসকানি ছড়িয়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও মেটা সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এটি বাস্তবে সহিংসতায় রূপ নেয়। ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, পরদিন ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা-অগ্নিসংযোগ ঘটে।
১৫ ডিসেম্বর থেকে ‘ভারতবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলন’ গ্রুপে (৬৮ হাজার সদস্য) প্রথম আলোর ছবিতে লাল ক্রস দিয়ে ‘জয় বাংলা না করা পর্যন্ত লাফালাফি বন্ধ হবে না’ পোস্ট হয়। ১৭ ডিসেম্বর ‘ভারতবিরোধী সৈনিক’ গ্রুপে (লক্ষাধিক সদস্য) ‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দাও’ বলে পোস্ট। হামলার ৩২ ঘণ্টা আগে থেকে আহ্বান তীব্র হয়।
অনলাইন উসকানির ধারাবাহিকতা ও সহিংসতার যোগসূত্র
প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে মব জড়ো হওয়ার আগে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ফেসবুকে অন্তত নয়টি পোস্ট করা হয়, যেখানে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একটি পোস্টে লেখা ছিল, ‘প্রথম আলো জ্বালিয়ে দাও, দিল্লি স্টার গুড়িয়ে দাও, উড়িয়ে দাও ভারতীয় এম্বাসী, ভারতের আধিপত্য’। পোস্টটি ‘Pinaki Bhattacharya – পিনাকী ভট্টাচার্য’ নামে ১ লাখ ৫৭ হাজার সদস্যের একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করা হয়েছিল। এমন একটি প্রোফাইল থেকে সেটি করা হয়েছে, সেখানে নিয়মিত কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।

১৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টায় কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর সামনে মব জড়ো হয়। রাত ১০-১১টায় ৯টি পোস্টে সরাসরি আহ্বান। রাত পৌনে ১২টায় হামলা শুরু। মব ইটপাটকেল, শাটার ভাঙে, ভিতরে ঢুকে ভাঙচুর করে আগুন ধরায়। ইলিয়াস হোসাইন রাত সোয়া ১১টায় ‘সবাই প্রথম আলোয় আসুন’ পোস্ট করে (৭৭ হাজার প্রতিক্রিয়া)। ৫ মিনিট পর ‘প্রথম আলোর একটা ইটও যেন না থাকে’ (৯৫ হাজার প্রতিক্রিয়া)। পোস্টগুলোতে ৩ লাখ ৬০ হাজার এনগেজমেন্ট।

ডেইলি স্টারে মধ্যরাত ১২:৩৫-এ হামলা। ইলিয়াসের পোস্ট ‘প্রথম আলো ডান, ডেইলি স্টারে চলে আসুন’ (৭৭ হাজার প্রতিক্রিয়া)। মব ফটক ভেঙে ভিতরে ঢুকে ভাঙচুর করে তিন তলায় আগুন ধরায়। ২৯ কর্মী ধোঁয়ায় আটকে থাকেন। ফায়ার সার্ভিস মবের বাধায় পৌঁছাতে পারে না। রাত আড়াইটায় আগুন নেভানো শুরু। পরদিন উদীচীতে হামলা।
১৮ ডিসেম্বর রাত ১১:৩৮-এ ছায়ানটকে লক্ষ্য করে ফারুক খান চার স্থানের তালিকা দেন (৮৫০০ প্রতিক্রিয়া, ৩০০ শেয়ার)। মীর জাহান ‘তালিকা যোগ করো’ বলে পোস্ট। ১৯ ডিসেম্বর দুপুর সাড়ে ৭টায় ছায়ানটে আগুন।
হামলার পর ৯৫৮ পোস্টে উদযাপন, ৩ লাখ ৬০ হাজার প্রতিক্রিয়া। ১০ লাখ সদস্যের ৮ গ্রুপে ৮৮ পোস্ট উসকানি। পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসাইন এক বছর ধরে ‘ভারতের দালাল’ বয়ান তৈরি করছেন। ‘দিল্লি স্টার’ পেজগুলো উঠেছে।
মেটা-সরকারের ব্যর্থতা ও পর্যবেক্ষণের অভাব
ফেসবুক কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন সত্ত্বেও মেটা অ্যাকশন নেয়নি। বিটিআরসি ১৬৫ কনটেন্ট রিপোর্ট করে, ১৯ ডিসেম্বর বিটিআরসি মেটাকে চিঠি দেয়। প্রেস সচিব শফিকুল আলম স্বীকার করেন সাহায্য করতে পারেননি। পুলিশ অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এসএন নজরুল বলেন, হস্তক্ষেপে গুলি চলতো। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত বলেন, যানজটে দেরি হয়েছে। জাতিসংঘের আইরিন খান বলেন, সরকার-প্ল্যাটফর্মের ব্যর্থতা সহিংসতা তৈরি করেছে। বিটিআরসি জানায়, মেটা সহযোগিতা করেনি।
২০২৪ নভেম্বর থেকে বয়ান তৈরি, ১২ ডিসেম্বর শরিফ হাদির গুলিতে তীব্রতা। পদ্ধতি: ১৫-১৯ ডিসেম্বর কীওয়ার্ড সার্চ করে ৩৬৬৪ পোস্ট বিশ্লেষণ।
মেটা-সরকারের ব্যর্থতা: পর্যবেক্ষণহীনতায় সহিংসতা
ফেসবুক কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন সত্ত্বেও মেটা অ্যাকশন নেয়নি। বিটিআরসি ১৬৫ কনটেন্ট রিপোর্ট করে, ১৯ ডিসেম্বর চিঠি দেয়। প্রেস সচিব শফিকুল আলম স্বীকার করেন সাহায্য করতে পারেননি। পুলিশ অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এসএন নজরুল: হস্তক্ষেপে গুলি চলতো। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত: যানজটে দেরি। জাতিসংঘের আইরিন খান: দায়মুক্তি সংস্কৃতি সহিংসতা তৈরি করেছে। বিটিআরসি: মেটা সহযোগিতা করেনি। ফায়ার সার্ভিস লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম: মবের বাধায় দেরি। সেনাবাহিনী সাহায্য করে।
পদ্ধতি
২০২৫ সালের ১৫-১৯ ডিসেম্বরে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দিল্লি স্টার, প্রথম আলু, ছায়ানট, উদীচী—এ ধরনের কীওয়ার্ড ব্যবহার করে যেসব ফেসবুক পোস্ট করা হয়েছে হামলার সময় ও পরবর্তীতে, সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর এই চার প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সরাসরি হামলার আহ্বান জানিয়েছে অথবা হামলার পর তা নিয়ে উপহাস বা উদযাপন করেছে, সেই পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
