লেখকঃ অদিতি করিম
১৮ মাসের অন্তর্বর্তী শাসন শেষে অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর শুরু হয়েছে মূল্যায়ন কী দিলেন তিনি দেশকে, আর কী নিলেন
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি যে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিলেন, তা ছিল বিশাল। দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতির লাগাম টানা, মানবাধিকার সুরক্ষা, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সমর্থক ও সমালোচকদের মূল্যায়নে তার শাসনকাল নিয়ে মতভেদ তীব্র।
সমালোচকরা বলছেন, গত দেড় বছরে দেশে ‘মব কালচার’ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পকারখানা বন্ধ, বেকারত্ব বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বাড়ার অভিযোগও উঠেছে।
অর্থনীতির সূচক নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমেছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
গণমাধ্যমের ওপর হামলা, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ও ক্রীড়াক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
ড. ইউনূস দায়িত্বকালীন সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক সফর করেন। সমালোচকদের মতে, এসব সফরের বাস্তব অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক ফল দৃশ্যমান ছিল সীমিত।
তবে তার সমর্থকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে তার বৈশ্বিক যোগাযোগ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি ‘থ্রি জিরো’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিঃসরণ দর্শন তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
তার দায়িত্বকালে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন, করছাড় বা লাইসেন্স পেয়েছে—যেমন গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস ও গ্রামীণ টেলিকমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।
গ্রামীণ ব্যাংকের শেয়ার কাঠামো পরিবর্তন ও কর অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ এতে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, সমর্থকরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত আইনি কাঠামোর মধ্যেই হয়েছে এবং গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার সময় গণতান্ত্রিক সংস্কার, জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংস্কার কমিশন গঠন, কিছু অধ্যাদেশ জারি ও নির্বাচন আয়োজন তার শাসনামলের অংশ ছিল।
তবে সমালোচকরা বলছেন, কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি।
একজন নোবেলজয়ী শান্তির প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মানুষটি ১৮ মাস শেষে দেশকে কী দিয়ে গেলেন এ প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
কারও মতে, তিনি সংকটের সময়ে স্থিতি ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অন্যদের মতে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান ছিল বিস্তর।
