বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় উন্মুক্ত মঞ্চে, জনগণের উপস্থিতিতে। প্রথা ভেঙে এমন আয়োজন যেন তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাপথেরই প্রতীক বিতর্ক, প্রতিকূলতা আর প্রত্যাবর্তনের গল্প।
পরিবার, ইতিহাস ও উত্তরাধিকার
১৯৬৮ সালের ২০ নভেম্বর জন্ম নেওয়া তারেক রহমান এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরোত্তম মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের যোদ্ধা, পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি। তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের বিরোধীদলীয় নেত্রী।
শৈশবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে পিতার মৃত্যুর শোক, কৈশোরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাপ সবই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিত গড়ে দেয়। ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু (২০১৫) পরিবারকে আরেক দফা আঘাত করে।
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির মাঠে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী থেকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মায়ের সঙ্গে প্রচারণায় সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক হাতেখড়ি।
২০০১ সালে বিএনপি সরকারে এলেও তিনি সরাসরি মন্ত্রী হননি; বরং তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে মন দেন। ‘একটি উদ্যোগ একটু চেষ্টা’ স্লোগানে ৬৪ জেলায় ২০টি তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করে সংগঠনকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।
কারাবরণ, নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন
২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার, প্রায় ১৮ মাস কারাবাস, পরে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গমন এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় প্রবাসজীবন।
এই সময় সোশ্যাল মিডিয়া ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থেকে দল পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার কারাবরণের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর তাঁর বক্তব্য “বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়” ব্যাপক আলোচিত হয়। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত।
নির্বাচনী বিজয় ও শপথ
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। দুটি আসনে জয়ী হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত ঢাকা-১৭ আসন রাখেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় উন্মুক্ত শপথের মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব নেন যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
সামনে কী?
তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, “আই হ্যাভ এ প্ল্যান।” তৃণমূল ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও রাজনৈতিক সংস্কার এই তিনকে সামনে রেখে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু। দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় তাঁর আরোহন—সমর্থকদের কাছে প্রত্যাবর্তনের গল্প, সমালোচকদের কাছে নতুন পরীক্ষার সূচনা।
