অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘সাজানো নির্বাচন’ ও ‘বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় বসানোর খেলা’ আখ্যা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় জনগণকে ভোট দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “এই নির্বাচন সাজানো নির্বাচন। আপনাদের কাছে অনুরোধ, এই নির্বাচনে ভোট দিতে যাবেন না। বাংলাদেশের যদি ভালো চান, ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে চান, তাহলে ভোট কেন্দ্রে যাবেন না।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত দেড় বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “আমি জানি আপনারা খুব বিরক্ত। কোনো আইনশৃঙ্খলা নেই, অর্থনীতি পড়ে গেছে, গণতন্ত্র নেই। আপনারা ভয়ে থাকছেন। সবাই বিরক্ত, ভোট দিয়ে এই সরকার চালিয়ে দিতে চান। কিন্তু ভোট দেন বা না দেন, এই সরকার নির্বাচনের পর থাকছে না।” তিনি জনগণের এই মনোভাবকে অস্বীকার না করে বলেন, এই নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত। “রেজাল্ট কী হবে, কত শতাংশ ভোট পড়বে—সব নির্বাচন কমিশন আগেই ঘোষণা করে দিয়েছে। এটা সম্পূর্ণ নাটক।”
সজীব ওয়াজেদ অভিযোগ করেন, এ নির্বাচনে দেশের অর্ধেক সংখ্যক রাজনৈতিক দলকে বাদ দেওয়া হয়েছে। “শুধু আওয়ামী লীগ নয়, স্বাধীনতাপন্থী সব দল, প্রগতিশীল সব দলকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য এ নির্বাচন হচ্ছে।” তিনি জামায়াতের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, “যেই জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, ৩০ লাখ মানুষের রক্তে রাঙানো স্বাধীনতার বিরোধী—তাদের ক্ষমতায় বসানোর চক্রান্ত চলছে।” এ অভিযোগ নির্বাচনী পরিস্থিতিতে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে।
নির্বাচনকে গণভোট হিসেবে প্রচার করা সত্ত্বেও সজীব ওয়াজেদ বলেন, “সংস্কার গায়ের জোরে একতরফা করলে টেকে না, ঠিক হয় না। ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসন, গণভোট দিয়ে সংস্কারের চেষ্টায় গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে। এই গণভোটেও একই ফল হবে।” তিনি সতর্ক করেন, “রাজনৈতিক সংকট-সংঘর্ষ আবার ফিরে আসবে। আজ হোক কাল হোক, আন্দোলন হবে, আবার এই পরিস্থিতি ফিরে আসবে।” এ কথা ৭৫ সালের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে তিনি জনগণকে ভোট বয়কটের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত’ করার আহ্বান জানান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে থাকায় সজীব ওয়াজেদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগের অভিযোগ খণ্ডন করে দলের মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। গত দেড় যুগ ধরে মূলধারার রাজনীতিতে ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’র আলোচনার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বৃত্তে জল্পনা চলছে, আওয়ামী লীগের ভার শেখ হাসিনার তনয়ের কাঁধে আসতে পারে। এই ভিডিও বার্তা সেই সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সজীবের এই ডাক নির্বাচনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে জনগণের মধ্যে নতুন ধরনের আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল রয়েছে। সংস্কারের নামে গণভোট ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চলছে, যা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সজীব ওয়াজেদের এই বক্তব্য আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্যম সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে নির্বাচনকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
এই বার্তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা কি না, তা নির্ভর করবে জনগণের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে স্পষ্টতই এটি নির্বাচনী পরিবেশে নতুন ঝড় তুলেছে।
