নিজস্ব প্রতিবেদক
কোরআন অনুযায়ী নারীদের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার সুযোগ নেই বলেই জামায়াতে ইসলামীতে নারীরা কখনো ‘আমির’ হতে পারবে না বলে জানিয়েছেন দলটির মহিলা বিভাগের সাধারণ সম্পাদক নূরুন্নিসা সিদ্দিকা।
রবিবার নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
যদিও সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো নারী প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, এটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামী আদর্শভিত্তিক সংগঠন এবং ইসলাম মেনে চলাই তাদের জন্য স্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, পবিত্র কোরআনে পুরুষকে নারীদের পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসলামের একটি নির্দেশ এবং ফরজ। সে অনুযায়ী কোনো ইসলামী সংগঠনে নারীরা শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, এই নীতিকে মেনেই তারা ঈমান এনেছেন এবং সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তবে শীর্ষ পদে নারী থাকা জামায়াতের কাছে মুখ্য নয় বলে মন্তব্য করেন নূরুন্নিসা সিদ্দিকা। তাঁর মতে, নারীদের অধিকার আদায় হচ্ছে কি না এবং তারা সম্মান ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন কি না—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে দুইজন নারী দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তাতে নারীদের সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না, নারীদের প্রতি সহিংসতা কমেছে কি না কিংবা নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না—সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
তার ভাষায়, শুধু শীর্ষ পদে নারী থাকলেই নারীর অবস্থার পরিবর্তন হয়—এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। নারী বা পুরুষ—যেই নেতৃত্বে থাকুক, তিনি যদি মানবিক হন এবং নারী-পুরুষ সবার মর্যাদা নিশ্চিত করেন, তবেই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, এ কারণেই জামায়াতে ইসলামীতে শীর্ষ পদে নারী আসা নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআনে কী নারী নেতৃত্ব হারাম বলা হয়েছে?
জামায়াত যে কোরআনিক আয়াতের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারীদের শীর্ষ নেতৃত্বে অযোগ্য বলছে, তা মূলত সূরা নিসা (৪:৩৪)।
তবে কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আয়াতের প্রেক্ষাপট পারিবারিক দায়িত্ব ও ভরণপোষণ সংক্রান্ত—রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংক্রান্ত নয়।
কোরআনে কোথাও নারীদের রাষ্ট্রীয় বা সংগঠনের নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং সূরা নামলে সাবা জাতির নারী শাসকের বর্ণনায় নেতৃত্বের যোগ্যতা হিসেবে প্রজ্ঞা, পরামর্শ ও ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—লিঙ্গকে নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই অবস্থান কোরআনের সরাসরি বক্তব্যের চেয়ে বেশি প্রতিফলিত করে দলটির আদর্শিক ব্যাখ্যা।
ফলে দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটার—নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন করে চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে, যেখানে একদিকে নারী ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের অযোগ্য ঘোষণা—এই দ্বৈত অবস্থান জামায়াতের রাজনৈতিক বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারী কর্মীদের নিয়ে উদ্বেগ জানাতে নির্বাচন কমিশনে জামায়াত
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদল সমসাময়িক বিষয় নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে বসে। বৈঠকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।
জামায়াতের নারী উইংয়ের প্রধান হাবিবা চৌধুরী বলেন, দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৫০ শতাংশ নারী হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। তাঁর দাবি, আসন্ন নির্বাচন নারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি ‘গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে’ নারীদের ভয় দেখিয়ে ভোট থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন জেলায় জামায়াত সংশ্লিষ্ট নারী কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১৫টি ঘটনার তথ্য তারা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের নারী নেত্রীরা দাবি করেন, তাদের সংগঠনের উপদেষ্টা ও নির্বাহী কমিটিতে ৪০ শতাংশের বেশি নারী প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এবং নারী নেতৃত্ব তৈরিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের পরিবেশ প্রসঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, মাঠ পর্যায়ে এখনো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত হয়নি। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে বড় বাধা বলে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের প্রতি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তারা।
অন্যদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জামায়াত নেত্রীরা বলেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কিছু ‘অযৌক্তিক অভিযোগ’ তোলা হচ্ছে।
