বাংলাদেশ সরকারের দেশি ও বৈদেশিক মিলিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ প্রথমবারের মতো প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা এবং দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া ঋণ ১০ লাখ ২৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা।
বৈদেশিক ঋণে দ্রুত বৃদ্ধি
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪.৩৪ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই ঋণ ছিল ৫০.৮৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।
দেশীয় ঋণও ঊর্ধ্বমুখী
দেশীয় ঋণের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০.৭৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা বেড়ে বর্তমানে ১১.৯৫ ট্রিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে এই পরিমাণ ছিল ৭.২২ ট্রিলিয়ন টাকা।
অর্থ বিভাগের ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, জুন শেষে মোট সরকারি ঋণ ছিল ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ মোট ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
সুদ পরিশোধে বাড়তি চাপ
ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের বোঝাও দ্রুত বাড়ছে। গত অর্থবছরে সরকার সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ২১ শতাংশ এবং দেশীয় ঋণের সুদ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদ পরিশোধ এক বছরে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বড় প্রকল্প ও বাজেট সহায়তা
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থছাড় বৃদ্ধি বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এমআরটি লাইন-৬, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল ও শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে থাকায় ঋণ ছাড় বেড়েছে।
এছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সহায়তায় বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩.৪১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, ভবিষ্যতে বড় মেগাঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার এবং দ্রুত ফল দেয় এমন প্রকল্পেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে না পারলে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ ভবিষ্যতে বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে।
আইএমএফের ঝুঁকি মূল্যায়ন
আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকিকে ‘মধ্যম’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঋণ-রপ্তানি ও ঋণ-রাজস্ব অনুপাত বাড়ায় ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হতে পারে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে। অর্থবছর-২৬ এর জন্য বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে ৮.৪৪ বিলিয়ন ডলারের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সামনে কী ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইপলাইনে থাকা প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঋণ বাস্তবায়িত হলে পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। আগামী কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ৫–৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। রাজস্ব আয় ও রপ্তানি বাড়ানো না গেলে ঋণের বোঝা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
