ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদে তিন নতুন পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এই পদে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত করার সিদ্ধান্তের মাঝে এই রদবদল হয়েছে।
এত বড় একটি আন্তর্জাতিক ক্রয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক দর যাচাই কমিটি গঠন না হলেও তড়িঘড়ি করে এই নিয়োগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। এটি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন, নাকি বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার কৌশল—এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক দিক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সরকার পরিবর্তন ও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তাদের কৌশলগত পণ্য, যেমন বোয়িং উড়োজাহাজ, দুর্বল অর্থনীতিকে স্বাভাবিক দামে দেয় না। এক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্য ও শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে দরকষাকষি প্রায় অসম্ভব। রাজনৈতিকভাবে নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়, বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতাও ব্যতিক্রম নয়।
আগের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনার সময় সীমিত দরকষাকষির সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়েছিল। একাধিক সূত্র জানায়, বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনার সময় সরকার মূল্য ও শর্ত পরিবর্তনের আগ্রহ দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বোয়িংয়ের বিক্রয় প্রস্তাব দেন। কূটনৈতিক সূত্র মতে, এটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না, বরং বোয়িং চুক্তিকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত ছিল। তবে বোয়িংয়ের প্রস্তাবিত মূল্য ও শর্ত আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের এক দায়িত্বশীল সূত্র বিডি ডাইজেস্টকে জানায়, বোয়িংয়ের প্রস্তাবনা থেকে সরে আসা ছিল সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। বোয়িংয়ের ‘প্যাকেজড ডিল’-এ মূল্য কমানো বা শর্ত শিথিলের সুযোগ ছিল না। তাই শেখ হাসিনার সরকার বিকল্প উৎসের দিকে যায়। ২০২৪ সালের শুরুতে তারা বোয়িংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস থেকে দশটি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। বোয়িং বাদ দিয়ে এয়ারবাসকে বেছে নেওয়াকে কূটনৈতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি বার্তা হিসেবে দেখা হয়। সূত্র দাবি করে, ওয়াশিংটন এতে অসন্তুষ্ট ছিল এবং সেই অসন্তোষ বিভিন্ন চ্যানেলে প্রকাশ পায়। এর কয়েক মাস পরেই আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্টির সরাসরি প্রমাণ নেই। তবে সময়গত এই মিল এবং ট্রাম্প সরকারের পূর্বতন বাইডেন প্রশাসনের বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনে হস্তক্ষেপের তথ্য সামনে আসায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও বারবার দাবি করেছেন যে বাংলাদেশের সরকার পতনে বাইডেন প্রশাসন বিপুল অর্থায়ন করেছে।
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টায়। ২০২৫ সালের ২৪শে নভেম্বর বোয়িং আবার ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে উড়োজাহাজ বিক্রির প্রস্তাব দেয়। ইউনূস সরকার নীতিগতভাবে তাতে রাজি হয় এবং বোয়িং থেকে বিমান কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত করার ইঙ্গিত দেয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সিদ্ধান্তের পরও কোনো আনুষ্ঠানিক ক্রয় কমিটি গঠিত হয়নি। এর মধ্যেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পর্ষদে পরিবর্তন এনে খলিল, তৈয়্যব ও আখতারকে নতুন পরিচালক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে, এই নিয়োগ বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার একটি পদক্ষেপ হতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে, আন্তর্জাতিক দরপত্র কাঠামো তৈরির আগেই কেন পর্ষদে এই পরিবর্তন? বোয়িং চুক্তির শর্ত, মূল্য ও দায়বদ্ধতা কি আগেই অনেকটা ঠিক হয়ে আছে?
বিশ্লেষকদের মতে, শত কোটি ডলারের উড়োজাহাজ চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ। এখানে দরকষাকষি, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশে এটি কতটা সম্ভব, সেটাই মূল প্রশ্ন। বোয়িং বনাম এয়ারবাসের এই অবস্থান পরিবর্তন দেশের কৌশলগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। সরকার পরিবর্তনে বড় চুক্তির নির্দেশনা বদলালে প্রশ্ন জাগে—এ সিদ্ধান্তগুলো কতটা নিজস্ব, কতটা আন্তর্জাতিক চাপের ফল? বোয়িং চুক্তি চূড়ান্ত হলে তার মূল্য, শর্ত ও দীর্ঘমেয়াদি দায়ই প্রমাণ করবে—বাংলাদেশ এবার স্বাধীনভাবে দরকষাকষি করেছে, নাকি নির্ধারিত দামে চুক্তি মানতে বাধ্য হয়েছে।
