পুলিশ সদর দপ্তর আরও জানায়, দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে সংঘাত বৃদ্ধির কারণে যত্রতত্র মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনা বাড়ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, উদ্ধারকৃত মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত না হলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় লাশ সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক সংগঠন (এমএসএফ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে খুব কম সংখ্যক অজ্ঞাতপরিচয় লাশের পরিচয় শনাক্ত হলেও অধিকাংশের পরিচয় অজানা রয়ে গেছে। সংগঠনটি মনে করে, অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্তকরণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যর্থতা তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এমএসএফ আরও উল্লেখ করেছে যে, শুধু মৃতদেহ উদ্ধারের তথ্য জানানোই যথেষ্ট নয়। পরিচয় উন্মোচন করে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, পুলিশের ছাড়পত্র ছাড়া তারা কোনো মৃতদেহকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেন না। তিনি আরও বলেন, সংস্থাটি লাশ বহনের জন্য কোনো খরচ নেয় না এবং নিজস্ব গাড়িতে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করে।
কয়েকজন মানবাধিকার কর্মকর্তা অভিমত দিয়েছেন যে, পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী শুধু মৃতদেহ উদ্ধারকেই তাদের দায়িত্বের শেষ মনে করে। অথচ তাদের মূল কাজ হলো পরিচয় শনাক্ত করা, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মৃতদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
নৌ পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও পরিচয় শনাক্তকরণ সম্ভব না হওয়ায় অধিকাংশ হত্যা মামলার কিনারা করা কঠিন। পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু ইউসুফ জানান, পচে যাওয়া মৃতদেহের আঙুলের ছাপ সাধারণত মেলানো যায় না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ছিন্নমূল ও ভবঘুরে মানুষদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকায় তাদের লাশ শনাক্তকরণে জটিলতা দেখা দেয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে সবার জন্য কেন্দ্রীয় কোনো ডেটাবেইস নেই। এতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অজ্ঞাতপরিচয় লাশের স্বজন খুঁজতে বেগ পেতে হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশে দক্ষ তদন্ত দলের অভাব রয়েছে। ক্রাইম সিন এরিয়া সুরক্ষিত রাখতে না পারা এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
নারায়ণগঞ্জ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত বছর নদী থেকে উদ্ধারকৃত ৪৪০টি মরদেহের মধ্যে ১৪১ জনের পরিচয় এখনো অজ্ঞাত।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যে জানা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত ৩০১ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এর মধ্যে ২০৯ জনের পরিচয় জানা গেলেও ৯২ জন এখনো ‘অজ্ঞাতপরিচয়’।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীর একটি ডোবা ও তুরাগের লেক থেকে দুই ব্যক্তির অর্ধগলিত ভাসমান লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত তাদের পরিচয় জানা যায়নি।
পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শামছুর রহমান জানান, ডোবায় ভাসমান লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার পর মৃতদেহটি ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।
পরিচয় শনাক্ত না হলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
নৌপুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি কুসুম দেওয়ান বলেছেন, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা তদন্ত এগিয়ে নিতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতে প্রধান বাধা। তাই অজ্ঞাতপরিচয় লাশের পরিচয় উন্মোচন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
