শামীম আহমেদ
১) আসছে জাতীয় নির্বাচন যদি আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে হয়, সেটি অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য হবে। আমি মনে করি ২০০৮ সালের পর এখন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল এবং তাদের সমর্থনের হার বাংলাদেশের ভোটারদের কাছে সর্বাধিক।
২) আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে যদি নির্বাচন হয় তবে দুটি ঘটনা ঘটবে। দ্বিতীয় জনপ্রিয়তম দল হিসেবে বিএনপি সর্বাধিক আসনে জয়লাভ করবে। এবং জুলাই ষড়যন্ত্রে জড়িতদের প্রতিরক্ষার জন্য তাদের সংসদে আসন বরাদ্দের নিশ্চিত ব্যবস্থা করা হবে তারা যে দলের হয়েই নির্বাচন করুক না কেন।
৩) নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হবে না। আওয়ামী লীগের ৪০ শতাংশ ভোটার, এবং রাজনীতি বোঝেন এবং এই প্রহসনের নির্বাচনে অনিচ্ছুক আরও অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ ভোট কেন্দ্রে যাবেন না। অর্থাৎ ৬০% ভোটারদের বাদ দিয়ে নির্বাচন শুরু হবে। যেসব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে তাদের সবাইও নানা কারণে কেন্দ্রে যেতে পারবেন না। তবে সংখ্যালঘুসহ আওয়ামী সমর্থক, কর্মী ও দরিদ্র মানুষকে অত্যাচার নিপীড়নের মুখে জোর করে ভোটকেন্দ্রে নেয়া হবে। এই সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ভোট পড়বে ৩০ শতাংশের মতো যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
৪) কিন্তু ভোট প্রদানের এই নিম্নহার সম্পর্কে আমরা জানব না। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো নিজেদের মধ্যে আঁতাত; প্রশাসন ও সামরিক-বেসামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় আগের থেকেই বিপুল পরিমাণ ভোট প্রদান করে রাখবে। তাই জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানোর জন্য ভোট কেন্দ্রে ব্যাপক মানুষের সন্নিবেশ ঘটানো হবে এবং ৭০ শতাংশের উর্ধ্বে ভোট প্রদান হয়েছে এমনটি দেখানো হবে। যা সর্বৈব মিথ্যা।
৫) কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র ও সার্বজনীন ভোটের অধিকারের দাবীতে সংঘটিত জুলাই ষড়যন্ত্র যে মূলত মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী আন্দোলন ছিল সেটি আরেকদফায় পরিষ্কার হবে। আওয়ামী লীগ সার্বজনীন নির্বাচন করে না, সুষ্ঠু নির্বাচন করে না বলে উল্লম্ফন করা দেশদ্রোহীরা বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম কারচুপির নির্বাচন করবে। রাতের নির্বাচন করবে।
৬) জামায়েতের চাইতে বিএনপি ভাল – এই ক্যাম্পেইনটি ইউনুস-আসিফ-সার্জিস-নাহিদ-মাহফুজ-ডাস্টবিন শফিক-পঞ্চতান্ডব ও ডার্টি মাস্টারমাইন্ডদের ৫ অগাস্ট পরবর্তী মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। জামায়েতের চাইতে বিএনপি অবশ্যই ভাল, এতে কোন সন্দেহ নেই। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সেকটর কমান্ডার ছিলেন। বিএনপিতে এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে। যেখানে জামায়েত স্বাধীনতার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং এখনও অনানুষ্ঠানিকভাবে তাই আছে। সুতরাং জামায়েত বাংলাদেশের জন্য কখনই ভাল ছিল না। কিন্তু এই ক্যাম্পেনটি কেন এত জোরালো যেখানে জামায়েতের বাংলাদেশে ১০% ভোটও নাই, নির্বাচনে তাদের জেতার তো কোন প্রশ্নই আসে না। তাহলে কেন আওয়ামী ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে জামায়েতকে রুখতে বিএনপিতে ভোট দেবার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে?
৭) বিএনপি ক্ষমতায় আসলে লাভবান হবে যারা সুবিধাবাদী, মধ্যপন্থী সুশীল, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী, পল্টি খাওয়া শিল্পী-সাহিত্যিক-মিডিয়া কর্মী-লেখক-সাংবাদিকরা। যেহেতু ১০% ক্ষমতায় থাকবে, তাই আপোষে কালো টাকা শাদা করার মতো দেশে প্রবেশের কিংবা দেশের ভেতর মাথা বের করে ধান্দাবাজি করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই ক্যাম্পেইনের সুবিধাভোগীরা সেটি জানে এবং তারা বিএনপির ২০০১ থেকে ২০০৬ এর শাসনামলে সেটি দেখেছে। জামায়েত আসলে কী হবে সেটি তারা জানে না। তাই বিএনপি আসলে তাদের আখের গোছাতে সুবিধা হয়।
৮) যারা মনে করেন জামায়েত আসলে দেশ উগ্র ইসলামপন্থীদের স্বর্গ হবে, কিন্তু বিএনপি আসলে হবে না – তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। দেশে উগ্র ইসলামপন্থীদের যে উল্লম্ফন আমরা গত ১৭ আসে দেখলাম, সেটা কি আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে দানা বাঁধেনি? আওয়ামী লীগ যেখানে এই র্যাডিকাল, জঙ্গীদের উত্থান ঠেকাতে পারেনি, সেখানে বিএনপি সেটা পারবে, ভাবার কোন কারণ আছে? কিংবা আদৌ তাদের তেমন কোন ইচ্ছা আছে?
৯) এখন প্রশ্ন উঠতে পারে বিএনপিও খারাপ, জামায়েতও খারাপ – তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমরা কি সারাজীবন আওয়ামী লীগকেই ভোট দিব? উত্তর হ্যা বলতে পারলে ভাল হতো, কিন্তু গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সে সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেবল একটি রাজনৈতিক দল আজীবন শাসন করার সুযোগ নেই। তাই দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, একটা না একটা সময় বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতেই হতো। আমরা দেখেছি বিএনপির শাসন মূলত দুঃশাসন। তারা উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত অদক্ষ। তবুও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের কাঠামোগত যে উন্নয়ন সাধন করেছেন, তাতে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসলে বিএনপি যত খারাপই করুক না কেন, হয়ত দেশের জন্য অত খারাপ হতো না।
১০) ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের, আদতে বাংলাদেশেরই পতন হয়েছে। ওই সময়টায় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছিল। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগসহ সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করলে বিএনপি যদি জয়ী হতো সেটি তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি জন্য অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হতো। প্রায় ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর, যখন প্রায় কিছু না করেই বিএনপি বাংলাদেশের প্রায় সবচেয়ে জনপ্রিয় দল – তখন তারা কেন আওয়ামী লীগ বিহীন একটি প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় আসতে চাইছে সেটি বুঝতে আমি অপারগ। সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন না করতে পারার ধাক্কা আওয়ামী লীগকে একটি বিশাল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শোধ করতে হচ্ছে, এটি কি বিএনপি দেখছে না? আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা হয়ত ৪-৫ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকতে পারবে, কিন্তু আসন্ন অর্থনৈতিক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিপর্যয় মাথায় রেখে কেন তারা এমন একটি পাতানো খেলায় অংশ নিচ্ছে সেটি বিস্ময়কর। এটি প্রমাণ করে ১৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপিও রাজনৈতিকভাবে দুরদর্শীতা হারিয়েছে। অন্যথায় তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে এনে, সেই নির্বাচনে জিতে সংসদে যাবার সাহস দেখাতে পারত।
১১) মূলত শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং বিএনপিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থাতেও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পাঠিয়ে একটি গোষ্ঠী, যারা জুলাই ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিয়েছে; তারা ২০০৬ সালের পরিকল্পিত মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। মূলত বাংলাদেশের শীর্ষ দুইটি রাজনৈতিক দলকে অকার্যকর করে তারা অগণতান্ত্রিক কাউকে দীর্ঘমেয়াদে ভবিষ্যতের পতনশীল বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়ে আঞ্চলিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় – এটি যদি অন্তত সুশীল সমাজ না দেখতে পায়, সেটি বাংলাদেশের জন্য দূর্ভাগ্যজনক ও করুন পরিণতির সূত্রপাত হতে যাচ্ছে।
১২) জামায়েতের চাইতে বিএনপি ভাল – এই প্রোপাগান্ডায় পা না দিয়ে, আওয়ামী লীগসহ সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, এই যৌক্তিক দাবী তুলুন। আপনি যে প্রোপাগান্ডার পালে হাওয়া দিচ্ছেন, সেটির মূল উদ্দেশ্য মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা যে আওয়ামী লীগ ছাড়াও বাংলাদেশ চলতে পারে, যা আদতে সম্ভব না। সরকারে হোক, বিরোধী দলে হোক – আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারে না। কোন প্রোপাগান্ডার মাধ্যমেই এই অমূলক ধারণার বাস্তবায়ন হতে দিতে পারি না আমরা। হ্যা জোর করে নির্বাচন করা সম্ভব, কিন্তু আপনি কেন একটি অন্যায় প্রোপাগান্ডার অংশ হবেন যার মূল উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগ বিহীন বাংলাদেশ সম্ভব সেটি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা?
আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণার আলোকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি সার্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চাই। এর কোন বিকল্প ছিল না, এখনও নেই।
