বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দুটি বড় জোট বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দলীয় জোট ভেতর থেকে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। আসন বণ্টন, প্রার্থী চূড়ান্তকরণ এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দুই জোটেই দেখা দিয়েছে বিভক্তি, সংশয় ও পারস্পরিক অবিশ্বাস।
বলা হচ্ছিল, আগামী নির্বাচনে মূল লড়াই হবে এই দুটি জোটের মধ্যেই। কিন্তু নির্বাচনের আগেই জোটগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট তাদের ঐক্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের টানাপোড়েন
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে সবচেয়ে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। বরিশাল সদর আসন নিয়ে এই টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে।
বরিশাল সদরের চরমোনাই ইউনিয়ন ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলালও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
একই জোটে থেকেও কেউই আসন ছাড়তে রাজি না হওয়ায় দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, চরমোনাইয়ের মতো এলাকায় জামায়াতের প্রার্থী দেওয়া ‘অশোভন’।
এ বিষয়ে সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, “এই এলাকায় আমাদের ভিত্তি। এখানে জোটের অন্য কোনো দলের প্রার্থী দেওয়া হওয়া উচিত নয়।”
অন্যদিকে জামায়াতের যুক্তি হলো, ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬—দুটি আসনেই মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। জামায়াত চায় তিনি একটি আসন ছেড়ে দেন। মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, আলোচনা করে সমাধানের আশাবাদ তারা এখনো ছাড়েননি।
তবে ইসলামী আন্দোলন জোটে থাকতে হলে অন্তত একশ’ আসনের কাছাকাছি বণ্টন চায়। এর চেয়ে কম হলে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি জোটেও বিদ্রোহ ও অস্বস্তি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিকর নয়। শরিক দলগুলোকে মাত্র ১২টি আসন ছাড়ায় জোটের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাওয়ায় জোটের প্রার্থীরা তৃণমূলে সমর্থন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর জোটের প্রার্থী হলেও স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে কাজ করছেন। নূর দাবি করেছেন, বিএনপির প্রায় ৯০ শতাংশ নেতা-কর্মী বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে রয়েছেন।
হাসান মামুন যদিও দল থেকে বহিস্কৃত, তবু স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সংগঠনগুলো তার নিয়ন্ত্রণে থাকায় জোটের প্রার্থী কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
নুরুল হক নূর বলেন, শরিকদের জন্য আরও বেশি আসন না ছাড়লে জোটের ভেতরে এই প্রবণতা আরও বাড়বে।
সমাধানের চেষ্টা, তবে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
বিএনপি দাবি করছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরাতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চলবে।
তবে শরিক দলগুলোর আশঙ্কা, নির্বাচনের পর বিদ্রোহীদের আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়া হলে তাদের রাজনৈতিক ক্ষতি হবে।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে এখনো আসন সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। প্রায় পৌনে তিনশ’ আসনে একাধিক দল মনোনয়ন জমা দেওয়ায় জোট ভাঙনের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটই ভেতর থেকে যে সংকট, অবিশ্বাস ও টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে, তার সমাধান না হলে ভোটের মাঠে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
